সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। পারমাণবিক শক্তি, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ ও জৈবপ্রযুক্তিসহ সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে সামনে রেখে দেশটি ঘোষণা করেছে ‘সেভেন মেজর সিড’ পরিকল্পনা।

বুধবার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সভাপতিত্বে ব্লু হাউসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের নতুন এই প্রযুক্তি কৌশল তুলে ধরা হয়। আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে নির্বাচিত খাতগুলোতে দক্ষিণ কোরিয়াকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর কাতারে নিয়ে যাওয়াই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পরবর্তী প্রজন্মের জ্বালানি প্রযুক্তি। ২০৩৫ সালের মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ছোট মডুলার পারমাণবিক চুল্লি বা এসএমআর বাণিজ্যিকভাবে চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি। প্রচলিত বড় পারমাণবিক চুল্লির তুলনায় এসএমআর আকারে ছোট এবং কম জায়গায় স্থাপন করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক ইউনিট ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

এসএমআরের পাশাপাশি ফিউশন শক্তি ও পরবর্তী প্রজন্মের নবায়নযোগ্য জ্বালানিকেও ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া।

মহাকাশ গবেষণায়ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি। ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদের পৃষ্ঠে একটি মহাকাশযান অবতরণ করানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মহাকাশ ও বিমান চলাচল প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এ খাতকে নতুন শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার।

কোয়ান্টাম প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে ১০০-কিউবিট ক্ষমতার একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ভবিষ্যতে ওষুধ উদ্ভাবন, নতুন উপাদান গবেষণা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও জটিল তথ্য বিশ্লেষণে এ প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হতে পারে।

মানুষের মস্তিষ্ক ও কম্পিউটারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের প্রযুক্তিতেও এগোতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া। ২০৩৫ সালের মধ্যে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসভিত্তিক পণ্য বাণিজ্যিক বাজারে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

দেশটির বিজ্ঞানমন্ত্রী বে কিয়ং হুন জানিয়েছেন, ‘সেভেন মেজর সিড’ উদ্যোগে সাতটি প্রযুক্তি ও কৌশলগত ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো—ছোট মডুলার পারমাণবিক চুল্লি, ফিউশন শক্তি, পরবর্তী প্রজন্মের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি, মহাকাশ ও বিমান চলাচল, উন্নত জৈবপ্রযুক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও উপকরণের সরবরাহব্যবস্থা।

সরকারের বিবেচনায়, ভবিষ্যতে এসব খাত শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সেমিকন্ডাক্টর, স্মার্টফোন ও গাড়ি শিল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, মহাকাশ গবেষণা, উন্নত জৈবপ্রযুক্তি ও নতুন জ্বালানি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।

এই বাস্তবতায় বর্তমান শিল্পের সাফল্যের ওপর নির্ভর না থেকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য নতুন ভিত্তি তৈরি করতে চাইছে সিউল। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়লে একদিকে যেমন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, অন্যদিকে তৈরি হবে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ।

বিজ্ঞানমন্ত্রী বে কিয়ং হুন বলেন, সরকার এসব প্রযুক্তির ‘বীজ’কে বড় হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে চায়। আগামী এক থেকে দুই দশকের মধ্যে প্রযুক্তিগতভাবে এমন অবস্থান তৈরি করাই লক্ষ্য, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা অন্য দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে উঠবে।