আজারবাইজানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার ওপর পরোক্ষ বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশটিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। নতুন পোশাকবিধির কারণে কয়েকটি স্কুলে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের একাংশ ক্লাস বর্জন করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রতিবাদ।
গত সেপ্টেম্বরে দেশটির সরকার স্কুলের পোশাকবিধিতে সংশোধনী অনুমোদন করে। নতুন নিয়মে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করা না হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে কার্যত হিজাব পরার ওপর বিধিনিষেধ তৈরি হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার পর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের ক্লাসে অংশ নিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তিতে পোশাকবিধি পরিবর্তন
আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আজারবাইজান প্রেস এজেন্সি (এপিএ) জানিয়েছে, সরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকে অভিন্নতা নিশ্চিত করতেই নতুন বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের দাবি, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকবিধির সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
দেশটির প্রায় ৯৬ শতাংশ মানুষ মুসলিম হলেও সংবিধান অনুযায়ী আজারবাইজান একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। একই সঙ্গে সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও রয়েছে।
এপিএর তথ্য অনুযায়ী, আজারবাইজানের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন রয়েছে এমন পোশাক বিশেষ অনুষ্ঠানে পরার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে এ জন্য শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের অধীন পেডাগজিক্যাল কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
শিক্ষকদের পোশাক পেশাগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তাদের দাবি।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বাস্তবায়নের নামে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে কতটা সংগতিপূর্ণ।
স্কুলে প্রবেশে বাধা, কান্নায় ভেঙে পড়েছে শিক্ষার্থীরা
নতুন পোশাকবিধির প্রতিবাদে আজারবাইজানের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভের পাশাপাশি অনলাইনেও প্রতিবাদ চলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, হিজাব পরার কারণে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না পেরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা নতুন বিধিনিষেধের প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করেছে।
শিক্ষিকা জাহরা হাসানোভা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, তাকে স্কুলে হিজাব পরে না আসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, হিজাব পরা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ হিজাব খুলে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেও সেটি তার নিজের ইচ্ছায় হওয়া উচিত।
কারাগারে অনশন শুরু করেছেন সাংবাদিক
হিজাবসংক্রান্ত নতুন বিধিনিষেধের প্রতিবাদে অনশন শুরু করেছেন কারাবন্দী সাংবাদিক পোলাদ আসলানভ।
রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ২০২০ সালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এই সাংবাদিক ১১৩ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
তার স্ত্রী গুলমিরা আসলানভার ফেসবুকে প্রকাশিত এক বার্তায় তিনি জানান, কারাগারে থেকেও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনশনই তার কাছে প্রতিবাদের একমাত্র উপায়।
এদিকে বিক্ষোভের মধ্যে আজারবাইজানে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়ার খবরও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ওপেন অবজারভেটরি অব নেটওয়ার্ক ইন্টারফেরেন্স এবং নেটব্লকসের মতো ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্য থেকে এ ধরনের বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।