সম্পত্তি কাউকে দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তির ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন। এমন বিধান রেখে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি আইনের সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনটি কোরআন-সুন্নাহবিরোধী—এমন অভিযোগ তুলে বিলটির বিরোধিতা করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। তবে তাদের আপত্তি ও সংশোধনী প্রস্তাব নাকচ হওয়ার পর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়।

রোববার জাতীয় সংসদে ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল’ পাসের জন্য উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

বিলে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ তাঁদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে কিংবা বিপরীতক্রমে এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করা হলে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন।

দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে দাতার ভোগাধিকার বহাল থাকবে। একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী ওই সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি নিয়ে বিধান থাকলেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই।

তিনি বলেন, জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দানকে হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি হিসেবে যুক্ত করা হচ্ছে। এই বিধান সব ধর্মাবলম্বীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

আইনমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন বিধানের কারণে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীনে হেবা কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর প্রভাবিত হবে না এবং কোনো সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিও তৈরি হবে না।

বিলটি নিয়ে সংসদে আলোচনার সময় বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর কোনো প্রশ্ন নেই। তবে প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে শরিয়তের স্পষ্ট ‘কন্ট্রাডিকশন’ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কি কোরআনের মূলনীতি রাখব, নাকি বাদ দেব?’

শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতি ও প্রয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এভাবে আইনটি উপস্থাপন করা হলে সমাজে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এবং হকদারের হক বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানও বিলটিকে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল, তারা কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন করবে না।

নাজিবুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পিতা-মাতা সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর তাঁদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এটি দুঃখজনক সামাজিক বাস্তবতা। তবে এমন সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ইসলামি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধী দলের আপত্তির জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইন হেবা কিংবা অন্য কোনো পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের ওপর প্রভাব ফেলবে না। এখানে মুসলিম আইনকে স্পর্শ করা হয়নি।

তিনি বলেন, এই আইনে যে ‘গিফট’ বা সম্পত্তি হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে, সেটি হেবা নয়। হেবা বা অন্য কোনো ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর এই আইনের কারণে বাধাগ্রস্ত হবে না। সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বিলটি আনা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী।

বিল নিয়ে বিতর্কের একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। তবে কিছুক্ষণ পর তাঁরা আবার সংসদ কক্ষে ফিরে এসে আলোচনায় অংশ নেন।

পরে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায় এবং বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হয়।