দেশের অর্থনীতির সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক জ্বালানি সংকটকে চিহ্নিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে গত আট মাসে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে অতিরিক্ত ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীতে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ইএসজি ডেটা প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। তবে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হলে প্রবৃদ্ধির হার আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে চাপ সৃষ্টি করেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যয়ে। গত আট মাসে এ খাতে অতিরিক্ত ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতির বিষয়েও কথা বলেন ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি জানান, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নেওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের সমর্থন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগ তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ দিতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য একই করহার বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে। এর মাধ্যমে উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ড. তিতুমীর বলেন, অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ, অর্থায়ন, জ্বালানি এবং যোগাযোগ খাতে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটি বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে সহযোগিতার আশ্বাস দেন ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত।
একই সঙ্গে যুব ও নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
এদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান নতুন ইএসজি ডেটা প্ল্যাটফর্মের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহে সংগঠনের সদস্যদের সহযোগিতা কামনা করেন।
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে হবে। প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে যাতে আবারও সময় বাড়ানোর প্রয়োজন না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, নতুন ইএসজি ডেটা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশের পোশাক কারখানাগুলো পরিবেশ, শ্রমিক কল্যাণ এবং সরবরাহব্যবস্থাসংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে জমা দিতে পারবে।
পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার লক্ষ্য রয়েছে এই উদ্যোগের।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ইএসজি ডেটা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পোশাকশিল্পের সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা সহজ হবে।
পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থায় যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শক্তিশালী করা এবং সরকারের জন্য সময়োপযোগী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এ প্ল্যাটফর্ম সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত নীতিমালা বাস্তবায়ন অপরিহার্য।





