গত সাত মাসে দেশে অভূতপূর্ব বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। তবে তাঁর এ দাবির সঙ্গে টিআইবির কাছে থাকা তথ্যের মিল নেই বলে জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তাঁরা এসব কথা বলেন। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মাহদী আমিন।
মাহদী আমিন বলেন, গত সাত মাসে বিএনপি সরকার অভূতপূর্ব বাক্স্বাধীনতা ও মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে। তবে ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের জঞ্জাল একবারে দূর করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি দাবি করেন, এই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একবারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় মদদে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু কিংবা বিরোধী দলের মত ও আদর্শ দমনের ঘটনাও ঘটেনি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, “আমরা দেখছি ইতিহাসের সর্বোচ্চ বাক্স্বাধীনতা, যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে অশালীন বা অশ্রাব্য আচরণও করা হচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি সর্বোচ্চ সহিষ্ণুতা এবং সহাবস্থান। কারণ, এটাই ছিল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা।”
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় কোথাও ঘাটতি থাকলে তা সংশোধনের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আলোকে মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা, আইনের শাসন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
তবে মাহদী আমিনের বক্তব্যের পর ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তাঁর কাছে থাকা তথ্য ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
তিনি বলেন, বাক্স্বাধীনতা চর্চার কারণে কমপক্ষে ৫২টি বিভিন্ন ধরনের হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫৮ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে বাক্স্বাধীনতা চর্চার কারণে এ ধরনের আইনে আটক প্রত্যাশিত ছিল না।
তিনি আরও বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৭৩০টির বেশি। এর মধ্যে ৫০৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং কমপক্ষে ৫০ জনের মৃত্যুর ঘটনা রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান জানান, আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি। সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে সাতজনের মৃত্যু এবং অন্তত একটি গুমের ঘটনায় একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব বিষয়কে উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফায় যেসব অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
তিনি বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে আইন চাপিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়।
পরে আবার বক্তব্য দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, রাষ্ট্রীয় মদদে কোনো ঘটনা ঘটছে না। আগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে হস্তক্ষেপ করা হলেও এখন অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনা ঘটলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে।
তিনি সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রায় ১০০টি অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করাকে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাহদী আমিন বলেন, আইন প্রণয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রয়োজন অনুযায়ী আইন সংশোধনের সুযোগ রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, একবারে শতভাগ পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবে বিভিন্ন পর্যায়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত সাত মাসে রাষ্ট্রীয় মদদে বা রাজনৈতিক কারণে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।





