নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য চেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। নাগরিকত্ব ছেড়ে থাকলে তার প্রমাণও প্রকাশ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
সোমবার (২৫ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন হাসনাত।
হুমায়ুন কবিরের নাগরিকত্ব নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে হাসনাত বলেন, বিষয়টির উত্তর সরাসরি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ হওয়া উচিত ছিল। তার অভিযোগ, স্পষ্ট জবাব দেওয়ার পরিবর্তে হুমায়ুন কবির প্রশ্নকারী সাংবাদিকদের নিয়ে তাচ্ছিল্যপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেছেন।
হাসনাতের পোস্টে হুমায়ুন কবিরের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘কোন পত্রিকা ঠিক? কে এত চিন্তিত যে আমাকে কাজ করতে দেবে না, হ্যাঁ? তাহলে তারা এত চিন্তিত কেন? তারা কি আবার ২০০৮ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে? আবার কি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন আমলের সেই চুলকানি শুরু হয়েছে? নাকি কী?’
এ ধরনের প্রতিক্রিয়া একজন প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেন হাসনাত। তিনি বলেন, কূটনীতিকেরা সাধারণত বিনয় ও কৌশলের সঙ্গে প্রশ্নের জবাব দেন। কোনো প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেলেও তা কূটনৈতিক ভাষায় করা সম্ভব। কিন্তু তার অভিযোগ, হুমায়ুন কবির নাগরিকত্বের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন তোলা গণমাধ্যমের প্রতিই আক্রমণাত্মক হয়েছেন।
সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান সবার জন্য সমান হওয়া উচিত উল্লেখ করে হাসনাত দাবি করেন, বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় কেউ সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হতে পারেন না। এনসিপির একজন নেতা বিদেশি নাগরিকত্বসংক্রান্ত কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল সে ক্ষেত্রে আইনি বিধান মেনে নিয়েছে।
হাসনাত আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের সময় বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করেছিলেন। এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) তথ্যের প্রসঙ্গও তুলে ধরে তিনি বলেন, সংস্থাটি তিনজনের কথা বললেও তার ধারণা সংখ্যাটি আরও বেশি।
হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ নেই বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন হাসনাত। তিনি বলেন, হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহযোগী হিসেবে ছিলেন। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তার যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্বের বিষয়টি জেনেই তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
হাসনাত বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার জবাবদিহি থাকা জরুরি। তারা হুমায়ুন কবিরের শাস্তি দাবি করছেন না; বরং তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না এবং করে থাকলে এর প্রমাণ কী—সেটি জানতে চাইছেন।
তার ভাষ্য, এ বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর না এলে হুমায়ুন কবিরের যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার আচরণকেও তিনি ক্ষমতার দম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন।
পোস্টে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ ও আবদুল মোমেনের প্রসঙ্গও টানেন হাসনাত। তিনি অভিযোগ করেন, তারা যথাক্রমে বেলজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করে মন্ত্রী হয়েছিলেন এবং ৫ আগস্টের পর নিজ নিজ দেশে চলে গেছেন।
আগের সরকারের মতো তথ্য গোপন ও অসততার সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি চান না উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, বিএনপির সরকারও যেন আওয়ামী লীগ সরকারের মতো না হয়ে ওঠে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। হাসনাতের মতে, সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তাকে ব্যঙ্গ করা, প্রশ্নের উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেওয়া কিংবা ২০০৮ ও মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের প্রসঙ্গ টেনে আনা একজন মন্ত্রীর পেশাদার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, এমন আচরণ সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে নিরুৎসাহিত করতে পারে এবং এর প্রভাব পুরো সংবাদমাধ্যমের ওপর পড়তে পারে। এতে সাংবাদিকদের মধ্যে ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা স্ব-নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলেও মত দেন তিনি।
অতীতে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের রাজনৈতিক তকমা দেওয়া এবং ভয় ও চাপের পরিবেশ তৈরির নজির রয়েছে উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, নতুন সরকারের সময় সেই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি তারা দেখতে চান না।
পোস্টের শেষে হুমায়ুন কবিরকে শুধু তার মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ নয়, নাগরিকত্বের বিষয়েও স্পষ্ট জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান হাসনাত। তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ অথবা না—বলুন।’





