আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্র শিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহিদুল আলম বলেছেন, শুধু প্রেস কার্ড থাকলেই কেউ সাংবাদিক হয়ে যান না; সাংবাদিকতার নীতি, মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়।

তিনি ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের স্বার্থে সাংবাদিকতা করার আহ্বান জানান।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলরুমে ‘জুলাই জার্নালিস্ট ইউনিটি (জেজেইউ)’-এর আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

শহিদুল আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যমের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক আন্দোলনে সেই বাস্তবতার বাইরে গিয়ে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সাংবাদিকদের এই ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, এ অর্জন ধরে রাখতে হলে গণমাধ্যমকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর মুখপাত্রে পরিণত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাংবাদিক’ বা ‘বিএনপির সাংবাদিক’—এ ধরনের পরিচয় সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগজনক। একজন সাংবাদিকের মূল পরিচয় হওয়া উচিত সাংবাদিক হিসেবে।

শহিদুল আলম আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো দলীয় সাংবাদিক গোষ্ঠী তৈরি হবে না, যেখানে দেশের স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।

সাংবাদিকতায় অর্থের প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, টাকা বড় ভূমিকা রাখে। আন্দোলনের মাধ্যমে একটি নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হলেও অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ব্যবস্থার কিছু উপাদান আবার ফিরে আসছে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

জনগণের স্বার্থকে সাংবাদিকতার প্রধান লক্ষ্য উল্লেখ করে শহিদুল আলম বলেন, অনেক সময় ব্যক্তি, দল কিংবা বড় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সাংবাদিকতায় প্রভাব ফেলে। এসব বিষয় থেকে সাংবাদিকদের দূরে থাকার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি প্রশ্ন করেন, কী ধরনের সাংবাদিকতা করলে সরকার পরিবর্তনের পর একজন সাংবাদিককে দেশ ছাড়তে হয়, জনগণের ভয়ে লুকিয়ে থাকতে হয় বা নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করতে হয়?

সাংবাদিকদের মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, কিছু মানুষ সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করেন। এক সরকারের সময়ে এক দলের সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত হয়ে পরবর্তী সময়ে অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

সাংবাদিকদের আর্থিক বাস্তবতার কথা স্বীকার করে শহিদুল আলম বলেন, জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজন থাকলেও সাংবাদিকতা শুধু অর্থ উপার্জনের পেশা নয়। একজন মানুষ যখন সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তখন তার মধ্যে একটি আলাদা আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন থাকে। সেই কারণেই মানুষ সাংবাদিকদের সম্মান করে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একসময় ক্যামেরা ঝোলানো থাকলেই মানুষ কাউকে সাংবাদিক হিসেবে সম্মান করত। তবে সেই পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া হলে সাংবাদিকতার মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তিনি বলেন, প্রেস কার্ড ব্যবহার করে বাড়তি সুবিধা নেওয়া, টেন্ডার পাওয়ার চেষ্টা করা কিংবা প্রেস ক্লাবের পরিচয়কে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করা সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

শহিদুল আলম বলেন, সাংবাদিকতার নীতি ও মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারলেই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে। তখন সাংবাদিকরা দেশের মানুষকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবেন।

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের ছবি ও ব্যানার পরিবর্তন করলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসে না।

তিনি বলেন, একসময় প্রেস ক্লাবের সামনে শেখ হাসিনার বড় ব্যানার ছিল। এখন সেখানে অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার ছবি বা ব্যানার ঝুললেও সেটি প্রকৃত পরিবর্তনের প্রতীক নয়।

দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে শহিদুল আলম বলেন, মানুষ আশা ও স্বপ্ন নিয়ে সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে থাকবে। সাংবাদিকরা সেই আস্থার মর্যাদা রাখবেন এবং একটি ভিন্ন বাংলাদেশ গঠনে ভূমিকা রাখবেন।