সন্তান কতটা লম্বা হবে-এ নিয়ে অনেক মা-বাবারই আগ্রহ থাকে। কেউ দুধের ওপর জোর দেন, কেউ আবার ডিম, মাছ কিংবা বিশেষ কোনো খাবার বেশি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। তবে শিশুর উচ্চতা বাড়ানোর জন্য আলাদা কোনো ‘জাদুকরি’ খাবার নেই। তার সম্ভাব্য উচ্চতার বড় অংশই নির্ধারিত হয় বংশগত বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে।

তবে জেনেটিক বৈশিষ্ট্যই সব নয়। বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে শরীর যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায়, তাহলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। অর্থাৎ তার শরীর যে উচ্চতা ও শারীরিক বিকাশে পৌঁছাতে পারত, অপুষ্টির কারণে সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।

এ কারণে শুধু একটি নির্দিষ্ট খাবারে গুরুত্ব না দিয়ে শিশুর দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ভিটামিন ডি, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজের ভারসাম্য রাখা জরুরি।

হাড়ের গঠন ও শক্তি বাড়াতে দুধ ও দুধজাত খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ে হাড়ের স্বাভাবিক বিকাশে সহায়তা করে। যে শিশুরা দুধ খেতে অনীহা দেখায়, তাদের টক দই বা পনির দেওয়া যেতে পারে। এতে একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।

শরীরের পেশি, হাড় ও অন্যান্য টিস্যু তৈরিতে প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। ডিম এ ক্ষেত্রে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর একটি খাবার। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন ডি ও ভিটামিন বি১২ রয়েছে। শিশুর বয়স ও খাওয়ার উপযোগিতা বিবেচনা করে ভালোভাবে রান্না করা ডিম নিয়মিত খাবারে রাখা যেতে পারে।

মাছও শিশুর খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। এতে প্রোটিনের পাশাপাশি নানা ধরনের পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের বিকাশ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রুই, কাতলা, ইলিশসহ দেশীয় বিভিন্ন মাছ শিশুকে দেওয়া যেতে পারে। তবে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে মাছের কাঁটা ভালোভাবে বেছে দেওয়া জরুরি।

প্রোটিনের উৎস হিসেবে শুধু প্রাণিজ খাবারের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা ও অন্যান্য ডালজাতীয় খাবার থেকেও প্রোটিন ও আয়রন পাওয়া যায়। প্রতিদিন ভাতের সঙ্গে ডাল কিংবা খিচুড়িতে ডাল ব্যবহার করলে শিশুর খাদ্যতালিকায় সহজেই পুষ্টি যোগ করা সম্ভব।

শাকসবজিও শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। পালংশাক ও অন্যান্য সবুজ শাকের পাশাপাশি গাজর, কুমড়া, মিষ্টি আলু এবং বিভিন্ন রঙের সবজিতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়। ভিটামিন এ শরীরের কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে, যা হাড় ও বিভিন্ন টিস্যুর জন্য প্রয়োজন।

অনেক শিশু সরাসরি শাকসবজি খেতে চায় না। সে ক্ষেত্রে ডাল, খিচুড়ি, ডিম কিংবা তার পছন্দের অন্য কোনো খাবারের সঙ্গে সবজি মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

ফলও শিশুর প্রতিদিনের খাবারে থাকা উচিত। কলা, পেয়ারা, কমলা, পেঁপেসহ মৌসুমি ফলে বিভিন্ন ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। একই ধরনের ফল প্রতিদিন না দিয়ে ঋতুভেদে ভিন্ন ভিন্ন ফল খাওয়ালে শিশুর খাবারে পুষ্টির বৈচিত্র্য বাড়ে।

বাদাম ও বিভিন্ন বীজ থেকেও শিশু স্বাস্থ্যকর চর্বি, প্রোটিন এবং খনিজ পেতে পারে। কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, চিনাবাদাম, তিসি ও কুমড়ার বীজ পরিমাণমতো খাবারে রাখা যায়। তবে ছোট শিশুদের গোটা বাদাম না দেওয়াই ভালো। কারণ তা শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বয়স অনুযায়ী গুঁড়া বা মিহি করে দিলে নিরাপদ।

হাড়ের সুস্থতার কথা উঠলে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভিটামিন ডির কথাও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হয়। ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। ডিমের কুসুম, চর্বিযুক্ত মাছ এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ কিছু খাবার থেকে এটি পাওয়া যায়। তবে শিশুর ভিটামিন ডির ঘাটতি আছে বলে মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাপ্লিমেন্ট দেওয়া ঠিক নয়।

শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি শুধু খাবারের ওপর নির্ভরশীল নয়। পর্যাপ্ত ঘুম ও নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডও গুরুত্বপূর্ণ। সুষম খাবারের পাশাপাশি খেলাধুলা এবং বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিশ্রাম শিশুর সামগ্রিক শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে।

অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কম রাখা ভালো। কোমল পানীয়, অতিরিক্ত মিষ্টি ও প্যাকেটজাত খাবার শিশুর পেট ভরাতে পারে, কিন্তু বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পর্যাপ্তভাবে দেয় না।

শিশুর বয়স বাড়লেও উচ্চতা বা ওজন প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। সমবয়সীদের তুলনায় বৃদ্ধি অনেক ধীর মনে হলে কিংবা দীর্ঘদিন অপুষ্টির লক্ষণ থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসক শিশুর বয়স, উচ্চতা, ওজন এবং সময়ের সঙ্গে তার বৃদ্ধির ধরন মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন।

সব মিলিয়ে শিশুকে লম্বা করার জন্য আলাদা কোনো খাবার নেই। বরং দুধ, ডিম, মাছ, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের সমন্বয়ে তৈরি সুষম খাদ্যতালিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভালো পুষ্টি কোনো শিশুকে তার জেনেটিক সীমার বাইরে লম্বা করতে পারে না, তবে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও সুস্থ হাড় গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারে।