ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পুনর্বহালের পর হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দাব বন্ধের হুমকি সামনে এসেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, তেহরান তার মিত্র ইয়েমেনের হুথিদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংঘাতের নতুন ফ্রন্ট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি ও বাণিজ্যিক সরবরাহপথ ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইরানে মার্কিন হামলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হুথিরাও তাদের সামরিক তৎপরতা জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতকে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে ছড়িয়ে দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে তেহরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য সুবিধাজনক অন্যান্য রপ্তানি করিডোর বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনায় প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুবিধা হয় সবাই ভাগ করে নেবে, নয়তো সবার জন্যই তা বন্ধ থাকবে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ পথ দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক পণ্যবাহী জাহাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে।
প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি হুথিদের
সোমবার হুথিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে বাব আল-মান্দাব বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
হুথি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ বলেন, ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে ইয়েমেনে হামলা চালাতে উৎসাহিত করছে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে একটি সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। তখন তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাবে বলে তাঁর দাবি।
সোমবার সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সৌদি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে হুথিরা।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি তেহরানের প্রধান কৌশলগত অস্ত্র হলে বাব আল-মান্দাব হতে পারে তাদের সর্বশেষ বড় চাপ প্রয়োগের মাধ্যম। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখলের পর থেকে হুথিরা শহরটি এবং ইয়েমেনের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে।
হরমুজ ঘিরে হামলা-পাল্টা হামলা
গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় অন্তত ১১ ক্রু নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এর জবাবে মার্কিন বাহিনী সাত ঘণ্টার বিমান অভিযানে ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করার দাবি করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলায় দেশটির অন্তত তিনটি এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আইআরআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার ভোরে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় হোভেইজেহ শহরের একটি গম সংরক্ষণাগারে আঘাত হানে।
এর আগে মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দরনগরী বান্দার আব্বাসের আশপাশে এবং দক্ষিণ ইরানের সিরিকের কাছে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করে। এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
অন্যদিকে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর, কুয়েতের মিনা আবদুল্লাহ এলাকার একটি লজিস্টিক স্থাপনা এবং জর্ডানের আজরাকে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে।
জর্ডান জানিয়েছে, বুধবার ভোরে দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা হবে। সংঘাতের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।
বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি ট্রাম্পের
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে হামলার শেষ পর্যায়ের জন্য রাখা হবে, তবে শেষ পর্যন্ত সেগুলোতেও আঘাত করা হতে পারে।
এর আগে ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের ঘোষণা দিলেও পরে তা বাতিল করে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তির কথা জানান।
এদিকে সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম গত জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুনে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর গত সপ্তাহ থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন ও প্রেস টিভি
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন