লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব থেকে আমদানি করা বাংলাদেশের সর্বশেষ অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চালানটি আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দেশে আসছে। বিকল্প পথে জাহাজটিকে প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল অতিরিক্ত পাড়ি দিতে হচ্ছে।
এতে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলের চালানটি দেশে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় এক মাস বেশি সময় লাগবে। পরিবহন ব্যয়ও অতিরিক্ত প্রায় ৫.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) নথিপত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) দেওয়া বিএসসির তথ্যমতে, এমটি নিনেমিয়া নামের জাহাজটির রুট পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত ৫.৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এ ব্যয় ৩.৫ থেকে ৪ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনার আশা করছে সংস্থাটি।
গত ২৩ জুলাই সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে জাহাজটি বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সাধারণত লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে প্রায় ৪ হাজার ২০০ নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রামে পৌঁছায়।
তবে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এবার জাহাজটি জিব্রাল্টার প্রণালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে আসছে। এতে যাত্রাপথ প্রায় ৯ হাজার নটিক্যাল মাইল বেড়েছে এবং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৪ দিন বেশি লাগতে পারে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য অপরিশোধিত তেল বহনকারী জাহাজটি সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় গত ২৩ জুলাই জাহাজটির শিপিং এজেন্ট বাব আল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথে চলাচলের অনুমতি চায়। পরে জাহাজমালিক অতিরিক্ত ৫.৩৯৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় দাবি করেন।
বিপিসিকে পাঠানো বিএসসির চিঠি অনুযায়ী, অতিরিক্ত ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে জাহাজের বাড়তি ভাড়া বাবদ প্রায় ৩.৩৯ মিলিয়ন ডলার, অতিরিক্ত ভেরি লো সালফার ফুয়েল অয়েলের জন্য ১.০৩ মিলিয়ন ডলার এবং মেরিন গ্যাস অয়েলের জন্য ৪ লাখ ৫২ হাজার ২০০ ডলার।
এ ছাড়া সুয়েজ খাল পারাপারের মাশুল বাবদ ৫ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং সমুদ্রযাত্রাসংক্রান্ত অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও দাবির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জাহাজটির স্থানীয় শিপিং এজেন্টের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী হাবিবুর রহমান রুট পরিবর্তনের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, লোহিত সাগরে চলমান সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ঝুঁকির ফলে এমটি নিনেমিয়া বর্তমানে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে বাংলাদেশে আসছে। অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে জানানো হয়েছে।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের ড্রোন হামলার হুমকির কারণে রুট পরিবর্তন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, সাধারণত ১৩ দিনে যাত্রা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এবার প্রায় ৩৪ দিন দেরি হবে। বিপিসির মৌখিক সম্মতির ভিত্তিতে রুট পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে জাহাজমালিকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। দেশে পেট্রোলিয়াম পণ্যের মোট বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭২ লাখ টন।
সরকারি পর্যায়ের চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের পুরো পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন।
বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মো. জাহিদ হোসাইন বলেন, সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল আনার রুট পরিবর্তনের কারণে আমদানি সূচিতে বিঘ্ন ঘটছে এবং রিফাইনারির ব্যয় বাড়ছে।
তিনি জানান, বিএসসি অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি প্রাক্কলন জমা দিয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস এবং জাহাজমালিকের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা শেষে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে।
মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী এমটি নিনেমিয়া চলতি বছরের মে ও জুন মাসেও বাংলাদেশে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করেছে। ২০২৪ সালে নির্মিত জাহাজটির ধারণক্ষমতা এক লাখ ১৩ হাজার ৮৩৯ টন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন