দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলা ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে আগামী চার অর্থবছরে ১১৮টি কূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে পেট্রোবাংলা। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিজস্ব ড্রিলিং ফ্লিট সম্প্রসারণের পাশাপাশি বেশির ভাগ কূপ খননের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
২০২৬-২৭ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে এসব কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৪৬৬ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) নতুন গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ড্রিলিং রিগের ঘাটতি এবং নতুন রিগ কেনার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পেট্রোবাংলার পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৭টি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩০টি, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৩৩টি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৩৮টি কূপ খনন করা হবে।
পাঁচ রিগের মধ্যে সক্রিয় দুইটি
পেট্রোবাংলার অনুসন্ধান শাখা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) নিজস্ব পাঁচটি রিগ রয়েছে। এগুলো হলো—বিজয়-১০, বিজয়-১১, বিজয়-১২, বিজয়-১৮ এবং আইপিএস-১। এর মধ্যে তিনটি রিগ ওয়ার্কওভার বা কূপ সংস্কারের কাজে নির্ধারিত থাকায় উন্নয়ন ও অনুসন্ধানমূলক কূপ খননে বর্তমানে দুইটি রিগ সক্রিয় রয়েছে।
গড়ে ৩ হাজার ৫০০ মিটার গভীর একটি কূপ খনন, রিগ স্থাপন এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের সময় বিবেচনায় একটি রিগ দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ তিনটি কূপ খনন সম্ভব। এ ঘাটতি পূরণে নতুন ২ হাজার হর্সপাওয়ারের একটি রিগ কেনার পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। পাশাপাশি ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ারের আরেকটি রিগ কেনার জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস, অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, "গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এবং দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে—সরকারের বিশেষ গুরুত্বের সাথে সঙ্গতি রেখে আমরা আগামী চার অর্থবছরে ১১৮টি কূপ খননের একটি কর্মসূচি চূড়ান্ত করেছি।"
তিনি জানান, চিহ্নিত কূপগুলোর বেশির ভাগই আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া হবে।
পেট্রোবাংলার হিসাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে পরিকল্পিত কূপগুলো থেকে দৈনিক ১৭৫ এমএমসিএফডি, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৩৬০ এমএমসিএফডি, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪৩৬ এমএমসিএফডি এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ৪৯৫ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
একজন পেট্রোবাংলা কর্মকর্তা জানান, ডিপিপি চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদনের জন্য তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। তবে শুধু রিগ কেনা হলেই কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক অনুমোদন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ শেষ করার পর মাঠপর্যায়ে রিগ কাজে নামানো যাবে।
অনুমোদন পেয়েছে মাত্র তিনটি কূপ
১১৮টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এর বাস্তবায়নের গতি এখনো ধীর। পরিকল্পিত কূপগুলোর মধ্যে ৪৭টির প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি বা প্রশাসনিক পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। অন্য কূপগুলোর জন্য নতুন করে প্রস্তাব তৈরি করতে হবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এখন পর্যন্ত তিনটি কূপ খননের অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো হলো নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ-৫ ও বেগমগঞ্জ-৬ এবং সুনামগঞ্জের সুনেত্র-২। গত ২২ জুলাই ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাপেক্সের এ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
গ্যাস সরবরাহে অবকাঠামোও বড় চ্যালেঞ্জ
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কূপ খননের পাশাপাশি নতুন আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও প্রসেসিং প্ল্যান্ট নির্মাণও গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের অবকাঠামো তৈরিতে পেট্রোবাংলার সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছর থেকে এখন পর্যন্ত পেট্রোবাংলা ৩২টি কূপ খনন করে প্রায় ২৮৬ এমএমসিএফডি গ্যাস আবিষ্কার করেছে। তবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এর মধ্যে মাত্র ১৩৪ এমএমসিএফডি গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ফলে আবিষ্কৃত গ্যাসের অর্ধেকেরও বেশি এখনো উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।
পূর্বে খনন করা ৩২টি কূপের সঙ্গে নতুন ১১৮টি কূপের কার্যক্রম সফলভাবে শেষ করা গেলে সম্ভাব্য মোট ১ হাজার ৭৫২ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পেট্রোবাংলা।
প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, "লজিস্টিকসের বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোয়, তাহলে উত্তোলন করা এই গ্যাস দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি সংকট লাঘবে বড় ভূমিকা রাখবে।"
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চার বছর মেয়াদি এ কর্মসূচি বাপেক্সের কূপ খনন সক্ষমতার পাশাপাশি অনুসন্ধান থেকে দ্রুত উৎপাদনে যাওয়া এবং নতুন আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলার সক্ষমতারও পরীক্ষা নেবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, "একটি গ্যাস কূপের গড় গভীরতা ৩,৫০০ মিটার। রিগ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সময় হিসাব করলে—একটি রিগ দিয়ে বছরে গড়ে ৩টির বেশি কূপ খনন করাও সম্ভব নয়।"
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও পর্যাপ্ত রিগ নিশ্চিত করা না গেলে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।





