স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের নির্বাচন সামনে রেখে নতুন ও সমন্বিত আচরণ বিধিমালা, ২০২৬ জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দীর্ঘদিন পর দলীয় প্রতীক ছাড়া সম্পূর্ণ নির্দলীয় প্রতীকে হতে যাওয়া এসব নির্বাচনে প্রচারণার ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ করে ব্যানার, ফেস্টুন, হ্যান্ডবিল এবং প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট শর্তে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সচিব আখতার আহমেদের স্বাক্ষরে পৃথক গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে ২০১৬ সালের পুরোনো আচরণবিধি বাতিল করা হয়েছে। নতুন বিধিমালায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিয়মে সামঞ্জস্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইউপি নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার আগে জারি করা এ বিধিমালায় প্রচারণার মাধ্যম, সময়সীমা এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নির্বাচনে কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে সাদা-কালো ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ব্যবহারের পাশাপাশি নির্ধারিত সীমার মধ্যে বিলবোর্ড বসানো যাবে।
কমিশন বিলবোর্ডের সর্বোচ্চ আকার নির্ধারণ করেছে ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট। সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতি ওয়ার্ডে একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহার করা যাবে। উপজেলা নির্বাচনে পুরো উপজেলায় সর্বোচ্চ ২০টি এবং জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতি থানা বা উপজেলায় একটি করে বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রচারণার সামগ্রীতে প্রার্থীর ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের পলিথিনের আবরণ ও পিভিসি সামগ্রী ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। জীবন্ত কোনো প্রাণীকেও নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
মাইক ও শব্দবর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহারের সময়েও পরিবর্তন এসেছে। আগে দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও নতুন বিধিমালায় দুপুর ১২টা থেকে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মাইকিং বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারণায় ক্যারাভান বা ভ্রাম্যমাণ বাহন ব্যবহার করা গেলেও একজন প্রার্থীর জন্য একাধিক মাইক্রোফোন ব্যবহার করা যাবে না। জেলা পরিষদ নির্বাচনে মাইক বা শব্দবর্ধনকারী যন্ত্রের ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
প্রচার শিবির স্থাপনের ক্ষেত্রেও নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে পুরো উপজেলায় একজন প্রার্থীর একটি কেন্দ্রীয় ক্যাম্প থাকবে। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি এবং পৌরসভা এলাকায় প্রতি তিন ওয়ার্ডের জন্য সর্বোচ্চ একটি ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে। আগের নিয়মে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদের জন্য সব মিলিয়ে নির্দিষ্ট পাঁচটি ক্যাম্পের সীমা ছিল।
ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ থাকলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে কমিশন। প্রার্থী বা তার সমর্থকদের অনলাইন প্রচারণায় করা ব্যয় আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ভোটারদের প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে ব্যক্তিগত জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর কিংবা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে রাখা হয়েছে।
অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার নিষেধাজ্ঞার পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, মেয়র, চেয়ারম্যান, প্রশাসক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের শাস্তিও কঠোর করেছে নির্বাচন কমিশন। আগে আর্থিক জরিমানার সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ১০ হাজার টাকা। নতুন বিধিমালায় তা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান বহাল রাখা হয়েছে।
অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় নির্বাচন কমিশন কোনো প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলও করতে পারবে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আচরণবিধিতে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে নতুন বিধিমালা মাঠপর্যায়ে কার্যকর হবে।





