চলতি মাসের ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের নতুন পাসপোর্ট বিধি। এ নিয়ে ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকরা বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছেন। নতুন নিয়মের ফলে অনেকেই যুক্তরাজ্যে ফেরার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হচ্ছেন।
জেলেনা নামের এক ব্রিটিশ-লাতভীয় দ্বৈত নাগরিক এ বছরের শেষ দিকে দক্ষিণ আমেরিকায় ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরতে গেলে যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধার মুখে পড়তে পারেন। তিনি জানান, ১৬ বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও নতুন নিয়ম তাকে বিপাকে ফেলেছে।
ব্রিটিশ সরকার বলছে, অভিবাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সহজ করতে ব্যাপক সংস্কারের অংশ হিসেবে দ্বৈত নাগরিকদের প্রবেশের নিয়ম পরিবর্তন করা হচ্ছে। তবে জেলেনার মতে, এই পরিবর্তন 'বিশ্বাসভঙ্গের' শামিল।
তার মতো আরও অনেকে বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যে প্রবেশে বাধার আশঙ্কায় তারা ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ব্রিটিশ দ্বৈত নাগরিকরা যদি এমন কোনো দেশের নাগরিক হন, যার জন্য যুক্তরাজ্যের ভিসা প্রয়োজন হয় না, তাহলে তারা তাদের বিদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেই যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ করতে পারেন। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারির পর তা আর সম্ভব হবে না।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তাদের হয় ব্রিটিশ পাসপোর্ট, অথবা দ্বিতীয় জাতীয়তার পাসপোর্টের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য 'সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট'-এর নতুন ডিজিটাল সংস্করণ দেখাতে হবে। এর কোনোটি না থাকলে যুক্তরাজ্যে ফেরার অনুমতি নাও মিলতে পারে।
ব্রিটিশ পাসপোর্ট বা সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্ট-কোনোটিই নাগরিকত্ব অর্জনের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া হয় না। ফলে বহু দ্বৈত নাগরিক, যারা দশকের পর দশক যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তারা কখনো এসব নথির জন্য আবেদন করেননি।
এই দুটি নথি পেতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে এবং খরচও কম নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্কের ব্রিটিশ পাসপোর্টের খরচ প্রায় ১০০ পাউন্ড, আর সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্টের জন্য খরচ ৫৮৯ পাউন্ড।
দ্বৈত নাগরিকদের জন্য নতুন এই বিধি চলতি মাসে চালু হওয়া ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন (ইটিএ) ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। বড় ধরনের এই অভিবাসন সংস্কারের আওতায়, যেসব দর্শনার্থীর ভিসা প্রয়োজন নেই, তাদের যুক্তরাজ্যে যাওয়ার আগে ১৬ পাউন্ড ফি দিয়ে প্রবেশ অনুমতিপত্রের জন্য আবেদন করতে হবে। সরকার ভবিষ্যতে এই ফি ২০ পাউন্ডে বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।
দ্বৈত নাগরিকরা ইটিএর জন্য আবেদন করতে পারবেন না। তাদের নতুন নথি সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হবে। এখন যুক্তরাজ্যে ফেরার পথে যাত্রার আগে এয়ারলাইনগুলো এসব নথি যাচাই করবে।
নতুন নিয়ম আইরিশ পাসপোর্টধারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) অন্যান্য দেশের নাগরিকরা এর আওতায় পড়বেন।
২০২১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া বাসিন্দাদের ১ দশমিক ২ শতাংশ (৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬০০ জন) এবং যুক্তরাজ্যের বাইরে জন্ম নেওয়া বাসিন্দাদের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ (৬ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ জন) যুক্তরাজ্য-অন্যান্য দেশের দ্বৈত নাগরিক।
দেশটির সরকার বলছে, এই সংস্কারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
তবে সমালোচকদের দাবি, পরিবর্তনের সময়সীমা ঘনিয়ে এলেও যথাযথ প্রচার না থাকায় অনেকেই হঠাৎ করে নতুন নথির জন্য আবেদন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশেষ করে যারা ছুটি কাটাতে বা পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেশের বাইরে রয়েছেন, তারা পাসপোর্ট বা সার্টিফিকেট না পাওয়া পর্যন্ত বিদেশে আটকে পড়ার আশঙ্কায় আছেন।
লাতভিয়ায় জন্ম নেওয়া জেলেনা পড়াশোনার জন্য যুক্তরাজ্যে এসে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। গত নভেম্বরে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেন।
৩৪ বছর বয়সী এই চার্টার্ড সার্ভেয়ার বিবিসি নিউজকে জানান, নাগরিকত্ব পাওয়ার পর বড়দিনে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ায় তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন বিলম্বিত করেন। কারণ আবেদন প্রক্রিয়ায় তার লাতভীয় পাসপোর্ট জমা দিতে হতো।
সম্প্রতি তিনি নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়টি জানতে পারেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকা সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় এখনই নতুন নথির জন্য আবেদন করতে পারছেন না। সময়মতো পাসপোর্ট ফিরে না পাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিবিসি 'ইউর ভয়েস'-কে তিনি বলেন, 'এই অবস্থায় দক্ষিণ আমেরিকা সফরের পর আমি গ্লাসগোতে আমার ফ্ল্যাটে ফিরতে পারব না। সেখানে আমি ও আমার স্বামী থাকি। প্রায় ১৬ বছর ধরে আমি এই দেশে বসবাস করছি, পড়াশোনা করেছি এবং কর পরিশোধ করেছি।'
তিনি জানান, সফর শেষে লাতভিয়ায় ফিরে সেখান থেকে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করার পরিকল্পনা করছেন। এতে কয়েক সপ্তাহ বা মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
জেলেনা বলেন, 'আমি ভাগ্যবান যে আমার নিয়োগকর্তা বিদেশ থেকে কাজ করার বিষয়ে নমনীয়। তা না হলে এই কারণে আমার চাকরি থাকত না।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি যদি নাগরিকত্বের জন্য আবেদন না করে শুধু ইইউ পাসপোর্ট রাখতাম, তাহলে এখনকার চেয়ে ভালো অবস্থায় থাকতাম। পরিহাস হচ্ছে, আমি এই দেশের অংশ হতে চেয়েছি, অথচ মনে হচ্ছে আমাকে দেশছাড়া করা হচ্ছে। এটি বিশ্বাসভঙ্গের মতো মনে হচ্ছে।'
চার দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করা যুক্তরাজ্য-জার্মান দ্বৈত নাগরিক পেট্রা গার্টজেন জানান, নতুন নিয়ম নিয়ে যথাযথ যোগাযোগের অভাবে তিনি ক্ষুব্ধ।
শীতে কয়েক মাসের জন্য স্পেনে অবস্থানরত পেট্রা সেখান থেকেই দ্রুত পাসপোর্ট নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, 'আমি যখন ইতোমধ্যে স্পেনে, তখনই নিয়ম বদলে ফেলা হলো। আগে কোনো সতর্কবার্তা বা বড় ঘোষণা ছিল না। ফেসবুকের একটি পোস্ট দেখে বিষয়টি জানতে পারি। তখন মনে হলো, এখন কী করব?'
সরকার বলছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকেই পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশ্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, প্রভাবিত ব্যক্তিদের কাছে সেই তথ্য কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি।
প্রযুক্তি শিল্প বিশ্লেষক পেট্রা জানান, যুক্তরাজ্যের বাইরে থেকে আবেদন করতে হলে তাকে দক্ষিণ স্পেন থেকে মাদ্রিদে গিয়ে সাক্ষাতের সময় নিতে হবে এবং 'অত্যন্ত ব্যয়বহুল' সার্টিফিকেট অব এনটাইটেলমেন্টের জন্য আবেদন করতে হবে, যার জন্য তার ব্যয় আরও বাড়বে।
স্পেন থেকে যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন পেট্রা। তবে সেখানেও জটিলতার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
তিনি জানান, জার্মান পাসপোর্টের নোটারাইজড কপি গ্রহণে কর্তৃপক্ষ রাজি হলেও তার মূল নাগরিকত্ব সনদ চাওয়া হয়েছে, যা তার কাছে নেই-সেটি যুক্তরাজ্যে রয়েছে।
মার্চের শুরুতে যুক্তরাজ্যে ফিরে সেখান থেকে কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা রয়েছে পেট্রার। এর আগে জমা দেওয়া কাগজপত্র সময়মতো গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণ হবে কি না, তা নিয়ে তিনি 'উদ্বিগ্ন অপেক্ষায়' আছেন।
পরিবর্তনগুলো যেভাবে কার্যকর করা হয়েছে তাতে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। যুক্তরাজ্যই তার বাড়ি-চার দশক ধরে সেখানে বসবাস, বাড়ির মালিকানা, কাজ ও কর পরিশোধ-সবই সেখানে।
সুইস দ্বৈত নাগরিক শন ওয়েস্ট জানান, নতুন শর্তের কারণে তিনি ব্রিটিশ পাসপোর্ট নবায়ন না করে নাগরিকত্ব ত্যাগের কথাও ভাবছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক ব্রেক্সিটের পর সুইস নাগরিকত্ব নেন।
তিনি বলেন, তার কাছে এর কোনো মূল্য নেই। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে অস্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের জন্য ইটিএ ফি দেওয়াই তার কাছে বেশি পছন্দনীয়। কনস্যুলার সেবা হারানোর বিষয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন এবং যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনাও নেই বলে জানান।
নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়টি তিনি 'সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে' অনলাইনে পড়ে জানতে পারেন এবং তার মতে, এটি দ্বৈত নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ।
যুক্তরাজ্যে বসবাস করা নরওয়েজীয় দ্বৈত নাগরিক লিন কাথেনেস জানান, গত সপ্তাহে হোম অফিস থেকে তিনি নতুন নিয়মের বিষয়ে অবগত হয়েছেন।
পেশায় শিক্ষক কাথেনেস বলেন, আসন্ন একটি বিদেশ সফর নিয়ে এখন তিনি সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তিনি জানান, নবায়নের জন্য দেওয়া তার নরওয়েজীয় পাসপোর্ট সংগ্রহের অপেক্ষায় আছেন। সেটি হাতে পাওয়ার পরই যুক্তরাজ্যের পাসপোর্টের জন্য আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবেন।
তার ভাষায়, 'আর কোনো উপায় দেখছি না, ঝুঁকি নিতেই হবে।' তার বিষয়টি নিয়ে হোম অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রচার সংগঠন 'দ্য থ্রিমিলিয়ন'ও সরকারের যোগাযোগ কৌশলের সমালোচনা করেছে।
সংগঠনটির নীতিমালা ও অ্যাডভোকেসি প্রধান মনিক হকিন্স বলেন, পরিবর্তনের গুরুতর প্রভাব সম্পর্কে দ্বৈত নাগরিকদের সতর্ক করতে হোম অফিস যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি সরকারের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে ভ্রমণ পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়া দ্বৈত নাগরিকদের জন্য স্বল্পমূল্যের এককালীন ভ্রমণ অনুমোদন চালুর আহ্বান জানান।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র বলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে দ্বৈত নাগরিকদের সঠিক নথি বহনের বিষয়ে জনসাধারণের জন্য তথ্য উন্মুক্ত রয়েছে এবং ২০২৩ সাল থেকে ইটিএ চালু নিয়ে বিস্তৃত প্রচার কার্যক্রম চলছে।
তিনি আরও বলেন, অন্য নাগরিকত্ব যাই থাকুক না কেন, এই শর্ত সব ব্রিটিশ নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশেও একই ধরনের নিয়ম রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন