বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মধ্যে দেশের ঋণের পরিমাণ আরও এক লাখ কোটি টাকার বেশি বাড়িয়েছে বলে দাবি করেছেন রংপুর-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
আখতার হোসেন বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের ঋণ ছিল প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে ২৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তার ভাষ্য, মাত্র চার মাসে দেশকে আরও এক লাখ কোটি টাকার ঋণের জালে বাঁধা হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজেট আলোচনার আগে দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা দেখা জরুরি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৪০ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। বিপুল অর্থ পাচারের কারণে দেশের অর্থনীতি এখন খালি পাত্রের মতো হয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে আখতার হোসেন বলেন, দেশের বিপুল অর্থ খেলাপি ঋণ হিসেবে আটকে আছে। এমনকি সংসদের দুজন সদস্য এখনো শপথ নিতে পারেননি, কারণ তারা আদালতে খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত ইস্যুতে আটকে আছেন। এ বিষয়ে সরকারি দলের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মুদ্রাস্ফীতির বিষয়ে তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি এখন দুই অঙ্কের কাছাকাছি, প্রায় ১০ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ৪ শতাংশের সামান্য বেশি। এমন পরিস্থিতিতে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, সরকার দাবি করছে বাজেট ঘোষণার পর পণ্যের দাম বাড়েনি। কিন্তু বাজেটের আগেই তিন মাসের মধ্যে দুই দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ে পড়েছে, ফলে পণ্যমূল্য বাড়ার প্রক্রিয়া আগেই শুরু হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে চায়। তবে আইএমএফ অর্থ ছাড়ে আগ্রহ দেখায়নি, কারণ তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে বড় ধরনের সংস্কার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
এনবিআরের নীতি ও ব্যবস্থাপনা আলাদা করার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ বিষয়ে অধ্যাদেশ পাস হয়ে সংসদে উপস্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে তা কার্যকর না করে ল্যাপস হতে দিয়েছে। তার দাবি, তখনই সংস্কার মেনে নিলে অর্থমন্ত্রীকে বিদেশ থেকে খালি হাতে ফিরতে হতো না।
ব্যাংক খাত নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের অরাজকতা চলছে। ইসলামী ব্যাংক ছাড়াও আরও পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে। তার অভিযোগ, আগের মালিকেরা লুটপাট ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে দুর্বল করেছেন। অথচ তাদের আবার মালিকানায় ফেরার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, মালিকেরা সাড়ে সাত শতাংশ টাকা ফেরত দিতে পারলে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেতে পারেন। যারা ব্যাংক লুটপাট করে দেউলিয়া করেছে, তাদের কাছেই অল্প অর্থের বিনিময়ে ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী—তা অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চান তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে এবং ঘাটতি দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
তিনি বলেন, এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এনবিআর আদায় করেছিল ৩ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরেও আদায় সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকার মতো। যে প্রতিষ্ঠান ৪ লাখ কোটি টাকাও আদায় করতে পারে না, তার ওপর ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি লক্ষ্যমাত্রা চাপিয়ে ঘাটতি কম দেখানো জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
তার মতে, এনবিআর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে শেষ পর্যন্ত বাজেট ঘাটতি আরও বাড়বে এবং এটি বড় ঘাটতির বাজেটে পরিণত হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন