দেশে প্রথমবারের মতো রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরি করে মহাকাশে পাঠানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরির কারখানা এবং পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাটি থেকে প্রথম রকেট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য রয়েছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০ থেকে ৬০ বছর সময় লাগতে পারে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেডের (ডিডিসি) সঙ্গে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চুক্তি করে স্পারসো। রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ে আয়োজিত কর্মশালায় সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়া উপস্থাপন করা হয়। সরকারের অনুমোদন পেলে ২০২৭ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে।
সমীক্ষায় কুয়াকাটায় রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য পাঁচ হাজার একর জমির প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে মূল অবকাঠামোর জন্য ৩০০ একর, নিরাপত্তা বাফার জোনের জন্য ৫০০ একর এবং সহায়ক অবকাঠামোর জন্য প্রায় চার হাজার ২০০ একর জমি প্রয়োজন হবে।
চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে রকেট ও স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরির কারখানার জন্য ৪০০ একর জমি লাগবে। খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় ৩০০ একর জায়গায় স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে।
সমীক্ষায় রকেট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র নির্মাণে প্রায় দুই লাখ ৯৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। আর্থিকভাবে উৎক্ষেপণ কেন্দ্রটি লাভজনক না হলেও স্যাটেলাইট উৎপাদন হাবের অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ২১ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছে।
ডিডিসির প্রতিনিধিদের মতে, প্রকল্পটিকে তাৎক্ষণিক মুনাফার উদ্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
স্পারসোর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নূর হোছাইন শরীফি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে যে জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা তৈরি হবে, সেটিই হবে এর প্রধান অর্জন।
তবে পরিবেশগত ঝুঁকিকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কুয়াকাটার প্রস্তাবিত স্থানটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র, মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র এবং পরিযায়ী পাখির চলাচলের পথের কাছাকাছি। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও উপকূল ক্ষয়ের ঝুঁকিও রয়েছে।
চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে কারখানা নির্মাণ করা হলে কৃষিজমির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। প্রকল্পের তিনটি অংশই পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘রেড ক্যাটাগরি’র অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নির্মাণের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
আইনি কাঠামোর ঘাটতিও সমীক্ষায় তুলে ধরা হয়েছে। আধুনিক বাণিজ্যিক মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দেশে এখনো আলাদা কোনো ‘স্পেস অ্যাক্ট’ নেই। আন্তর্জাতিক আইন ও বিভিন্ন সংস্থার বাধ্যবাধকতাও পূরণ করতে হবে।
এ ছাড়া রকেট প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট উৎপাদনে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। প্রকল্পের শুরুতে ৪০০ থেকে ৬০৬ জন এবং পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে এক হাজারের বেশি কর্মীর প্রয়োজন হতে পারে। শিল্পপার্ক চালু হলে পাঁচ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
দক্ষ জনবল তৈরিতে ভারত, জাপান ও ইউরোপের মহাকাশ সংস্থায় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে মহাকাশ প্রকৌশল বিভাগ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
জমি অধিগ্রহণ, বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা, প্রতিবেশী দেশের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি এবং বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করাকেও প্রকল্পের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন