ইরানের বিরুদ্ধে টানা ষষ্ঠ রাতের মতো সামরিক হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
শুক্রবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) বরাতে বলা হয়, সর্বশেষ হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও দুর্বল করা। ইরানের বন্দর অবরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী জাহাজেও অভিযান চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও নৌবাহিনীর সহায়তায় ইরানের উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা, সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো এবং সামুদ্রিক সক্ষমতাসহ কয়েক ডজন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
একই সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় সেতু, একটি রেলস্টেশন, একটি বিমানবন্দর এবং একটি বন্দরনগরীর পাঁচটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমোজগান প্রদেশের বন্দর আব্বাসের পশ্চিমে একটি সেতুতে হামলার ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করার কথা জানিয়েছে বিবিসি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর দাবি, এসব হামলায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন।
পাল্টা হামলার দাবি আইআরজিসির
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, পাল্টা হামলায় ওমানে একটি মার্কিন সামুদ্রিক নজরদারি রাডার, কুয়েত ও বাহরাইনের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তু এবং সিরিয়ায় মার্কিন বিশেষ অভিযান কমান্ডের একটি ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্য, জর্ডান সীমান্তের কাছে সিরিয়ার আল-তানফ ঘাঁটিতে দুই দিন আগে চালানো হামলায় ইরানি সেনা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে এ আক্রমণ চালানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা সিরিয়ার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। এতে কোনো হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
অন্যদিকে ইরাকের কুর্দি বাহিনীর দাবি, এরবিল শহরের আকাশে উড়তে থাকা আটটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় অঞ্চলটির তেল পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
শুক্রবার চীন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংঘাত বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
বন্দর অবরোধ জোরদার
সেন্টকম জানিয়েছে, মঙ্গলবার থেকে পুনরায় শুরু হওয়া ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মার্কিন মেরিন সদস্যরা ওমান উপসাগরে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযান চালিয়েছেন।
এ ছাড়া অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করা তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন বাহিনী।
তাদের ভাষ্য, এর আগে ১৩ এপ্রিল থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত অবরোধে নয়টি জাহাজ অচল করা হয় এবং ১৪০টির বেশি জাহাজকে গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়।
আলোচনার পথ খোলা: হোয়াইট হাউস
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনো ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন।
তিনি বলেন, “ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চায় বলে জানিয়েছে। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। তবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালালে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে।”
অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, কোনো চুক্তি ইরানের স্বার্থ রক্ষা না করলে তা মেনে চলার কারণ নেই।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা বজায় রাখা দেশটির জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য।
বন্দিমুক্তি নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি
বুধবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দাবি করেন, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আটক মার্কিন নাগরিক ডেনা কারারিকে ইরান মুক্তি দিয়েছে। এ জন্য তিনি তেহরানকে ধন্যবাদও জানান।
কারারির আইনজীবী জ্যারেড জেনসারও জানিয়েছেন, তার মক্কেল যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছেন।
তবে ইরানের বিচার বিভাগ বৃহস্পতিবার দাবি করেছে, দেশটির কারাগার থেকে কোনো মার্কিন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া বা বিনিময় করা হয়নি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন