ইরান ও ইসরাইল–যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনা বিশ্বরাজনীতিকে এক নাটকীয় ও রক্তক্ষয়ী মোড়ে নিয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর সরাসরি উসকানি ও ইসরাইলের সঙ্গে যৌথ সামরিক অভিযানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প যেখানে ইরানি জনগণের মাধ্যমে সরকার পতনের প্রত্যাশা করেছিলেন, বাস্তবে ঘটেছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাহবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি-এর মৃত্যুর খবরে দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আবেগে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইরান।
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) এক ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে রাস্তায় নামার আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে শাসন পরিবর্তনে সহায়তা করছে। তবে খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তেহরানসহ সারা দেশে যে জনস্রোত নেমেছে, তা সরকার পতনের জন্য নয়—বরং নিহত নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে।
আল জাজিরা-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের রাস্তায় যে বিপুল জনসমাগম দেখা যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই খামেনি সমর্থক ও আগ্রাসনবিরোধী। যদিও কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে আতশবাজি ও আনন্দ মিছিলের ঘটনাও ঘটেছে, যেখানে খামেনি ও নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তেহরানের ইনকিলাব স্কয়ারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাজার হাজার মানুষ শোক প্রকাশ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। ঐতিহাসিক শহর ইসফাহানের নকশ-ই-জাহান স্কয়ারেও দেখা গেছে শোকার্ত মানুষের ঢল। সেখানে খামেনির প্রতিকৃতি বহন করে সরকার ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন সমর্থকেরা।
এ ছাড়া মাশহাদের ইমাম রেজা মাজার-এ খামেনির সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে হাজার হাজার মানুষের কান্না ও আহাজারিতে মাজার প্রাঙ্গণ শোকের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ইরানের প্রশাসন নিশ্চিত করেছে, মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইরান সরকার ৪০ দিনের জাতীয় শোক এবং সাত দিনের সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। এক বিবৃতিতে খামেনিকে ‘ইসলামের পতাকাবাহী ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক’ আখ্যা দিয়ে তাকে শহীদ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে জানানো হয়, এই হত্যাকাণ্ডের জবাব না দিয়ে ইরান বসে থাকবে না।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি নেতাদের ‘নোংরা অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তারা ইরানের রেড লাইন অতিক্রম করেছে এবং এর চড়া মূল্য দিতে হবে। অপরদিকে, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি অভিযোগ করেন, ইসরাইল নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় ইরানকে খণ্ডবিখণ্ড করতে চায়। তিনি ট্রাম্পকে ‘লুণ্ঠনের প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসি প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটিতে হামলার হুমকি দিয়েছে। ইতোমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে; এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত-এ একজন নিহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর ফলে ইরানের ক্ষমতার কাঠামোয় বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এখন দেশটির অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস-এর ৮৮ জন সদস্য পরবর্তী নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে বসবেন। বিশ্লেষকদের মতে, হয় খামেনির প্রস্তাবিত তালিকা থেকে নতুন নেতা নির্বাচন হবে, অথবা ততদিন চার সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল দেশ পরিচালনা করবে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান খামেনির হত্যাকে ‘মহা অপরাধ’ আখ্যা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিন সদস্যের একটি অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান।
খামেনির মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। ইরাকের রাজধানী বাগদাদেও মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা গ্রিন জোনের দিকে অগ্রসর হয়ে মার্কিন দূতাবাসে হামলার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে কেবল একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে দেখা বড় ভুল। তার কর্তৃত্ব ছিল রাষ্ট্রপ্রধান, সর্বাধিনায়ক এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক হিসেবে সর্বময়। বিশ্লেষক রাসুল সারদার আতাসের ভাষায়, খামেনির প্রতিটি নির্দেশ ইরানের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল, ফলে তার মৃত্যু দেশটির রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কাঠামোয় গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।
কৌশলগত বিশ্লেষক হারলান উলম্যান মনে করেন, খামেনিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের ভুল করেছে। তার মতে, ‘খামেনি এখন একজন শহীদ, এবং এর ফলে ইরানকে ঘিরে যেকোনো সমঝোতার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।’
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন