চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানতকারীদের স্বার্থ ও জনস্বার্থে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালককে অপসারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক এ ব্যাংকটিতে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয় পবিত্র ঈদুল আজহার আগে। গত ২৪ মে ব্যাংকের চেয়ারম্যান জোবায়দুর রহমান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খান পদত্যাগ করেন। একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ঈদের পর এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে ‘গ্রাহক ফোরাম’ ব্যানারে একদল ব্যক্তি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ শুরু করেন। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে তারা আন্দোলন চালিয়ে আসছেন।
চলমান অস্থিরতার মধ্যে গত কয়েক দিনে গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনার জন্ম দেয়।
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর ইসলামী ব্যাংককে পুনরায় ‘দখলের চেষ্টা’ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অভিযোগ করেন, ব্যাংকটিকে অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
এমন পরিস্থিতিতে গত বুধবার ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আশ্রাফুল আলমকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে পর্যবেক্ষক নিয়োগের পরও আন্দোলন থামেনি। সর্বশেষ শনিবার চেয়ারম্যানকে অপসারণসহ সাত দফা দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে ‘গ্রাহক ফোরাম’।
এরই মধ্যে রোববার ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা তারল্য সহায়তা পায়। সকালে অর্থ পাওয়ার পর বিকেল ৪টার দিকে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হুসাইনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকের পর রাত পৌনে ১০টার দিকে বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
গত ২৪ মে দায়িত্ব পাওয়া স্বতন্ত্র পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ খুরশিদ ওয়াহাব, আব্দুস সালাম, এস এম আব্দুল হালিম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাসুদ রহমান।
উল্লেখ্য, ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার সূত্রপাত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ পরিচালনা পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংকেও পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এস আলমের প্রভাবমুক্ত করার দাবিতে ব্যাংকের কয়েকশ কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার আন্দোলন করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের সামনে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে, যাতে অন্তত সাতজন গুলিবিদ্ধ হন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক এস আলমের নেতৃত্বাধীন পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পাঁচজন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে। সে সময় সাবেক ব্যাংকার মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয়। তবে ২০২১ সালে দায়িত্ব পাওয়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনিরুল মওলা তাঁর পদে বহাল ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন