সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি না মেনে বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের পথে এগোচ্ছে সরকারি দল। সরকারের ভাষ্য, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ দেবে বিশেষ কমিটি। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনী বিল উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে বিশেষ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে সংসদ থেকে ওয়াকআউটের পর পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করছে বিরোধী দল। সংসদে কমিটির বিরোধিতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথের কর্মসূচি জোরদার করার কথা জানিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে সংবিধান সংশোধন করা যায়। সরকার এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধনী বিল আনতে চায়।
১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি
গত সোমবার সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দল প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে। তাদের অনুপস্থিতিতেই কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাস হয়।
কমিটিটি ১৭ সদস্যের হওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দলকে পাঁচজন সদস্যের নাম দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও তারা কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। এ কারণে পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটিতে বিএনপির আট সংসদ সদস্যের পাশাপাশি গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. অলিউল্লাহকে রাখা হয়েছে।
তবে মো. অলিউল্লাহ জানিয়েছেন, তাঁকে না জানিয়েই কমিটিতে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটি গঠনের সময় তিনি সংসদে উপস্থিত ছিলেন না এবং পরে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি জানতে পারেন।
ইসলামী আন্দোলন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘৭০ শতাংশ জনগণের রায়কে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। সরকার যেভাবে এগোচ্ছে, তা জনগণের গণভোটের রায় প্রত্যাখ্যানের শামিল।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি
সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থেকেই বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এ কারণে তাঁরা বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন। সরকার গঠনে জনগণের দেওয়া ভোট মানা হলেও সংবিধান সংস্কারের পক্ষে দেওয়া গণভোটের রায় উপেক্ষা করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সরকার জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় না মানলে রাজপথে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
সরকারের অবস্থান
সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বলেন, প্রথমে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হলে পরবর্তী সময়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
তাঁর ভাষ্য, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতেও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। এ বিষয়ে আলোচনার উপযুক্ত স্থান সংসদের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।
এর আগে ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখনও বিরোধী দলকে পাঁচজন সদস্যের নাম দিতে বলা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
সংকটের আশঙ্কা বিরোধীদের
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক ও টেকসই পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, সরকার সংস্কার পরিষদ গঠনের পথে না গিয়ে দেশকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে অবিলম্বে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ ও রাজপথে আন্দোলনের পরিকল্পনা
বিরোধী দলের নেতারা জানিয়েছেন, বিশেষ কমিটির বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ শুধু সংসদে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সংসদে বিরোধিতা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মাঠের কর্মসূচিও জোরদার করা হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, গণভোটের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন একটি জাতীয় অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সরকার সেই অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে বলে তাঁর দাবি।
তিনি জানান, সংসদে বিরোধী দলের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান প্রশ্ন তুলেছেন, অতীতে সংবিধান সংশোধনের সময় বিশেষ কমিটির প্রয়োজন না হলেও এবার কেন তা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, আগের কয়েকটি সংশোধনী আদালতে বাতিল হওয়ায় বিরোধী দল মৌলিক সংস্কারের জন্য সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনও বিশেষ কমিটি গঠনের সমালোচনা করেছে। দলটির দাবি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও গণভোটে জনগণ মৌলিক সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় উপেক্ষা করে সরকার রাজনৈতিক প্রতারণা করছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি।
বিরোধের কেন্দ্রে দুই প্রক্রিয়া
সরকার ও বিরোধী দলের বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি। সরকার বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে সংশোধনী আনতে চায়।
অন্যদিকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে সংবিধানসংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিরোধী জোট সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে জুলাই সনদের সংবিধানসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এটি সাধারণ সংবিধান সংশোধন নয়; বরং মৌলিক সংবিধান সংস্কারের বিষয়।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন