সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সাবেক মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্র জানায়, আসল পরিচয় গোপন করে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন মোজাফফর। তার মেয়ের কর্মস্থলের তথ্য এবং নাকের নিচে থাকা একটি জন্মদাগের সূত্র ধরে তাকে শনাক্ত করা হয়।
ডিবি সূত্রের ভাষ্য, মোজাফফরের মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই তথ্যের ভিত্তিতে কয়েক মাস ধরে তার কর্মস্থল ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বনানী ডিওএইচএসের একটি বাড়ি চিহ্নিত করেন গোয়েন্দারা। পরে বাড়িটি নজরদারিতে রেখে মোজাফফরের পুরোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করা হয়।
বুধবার গভীর রাতে সাধারণ পোশাকে ডিবির একটি দল ওই বাসায় যায়। নিজেদের তার মেয়ের অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিলে এক বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি দরজায় আসেন। কর্মকর্তারা তার নাকের নিচে থাকা জন্মদাগ দেখতে পান বলে ডিবি সূত্র জানিয়েছে।
পরিচয় জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি নিজেকে মোজাফফর এবং বাড়ির মালিকের বাবা হিসেবে পরিচয় দেন। এরপর গোয়েন্দারা তাকে গ্রেপ্তার করেন।
মামলার নথির বরাতে সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে মোজাফফরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মামলার বিবরণে তাকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার রাতে মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফর রাষ্ট্রপতিকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন এবং গুলি চালান বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোন করে ইংরেজিতে বলেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’—এমন তথ্যও মামলার নথিতে রয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩১ মে সরকারি বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর মোজাফফর ও তার সহযোগী মেজর এস এম খালেদ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সামরিক আদালতে ১৩ সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হলেও তারা পলাতক ছিলেন।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনের দাবি, ভারতে অবস্থানের সময় মোজাফফর ছদ্মনাম গ্রহণ করেন এবং চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন আনেন। পুরোনো পরিচিতজন ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত করেন। ১৯৯৭-৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন এবং জাল নথি ব্যবহার করে একাধিক দেশ ভ্রমণ করেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি গোপনে বাংলাদেশে ফিরে বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন তিনি। সেখানে নিজেকে রাজনীতিবিমুখ একজন সাধারণ বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, মোজাফফর হোসেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রম সেনাবাহিনীর নিজস্ব বিচারিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন