‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র হবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল বা ব্যক্তির অর্জন নয়; এর মূল নায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।
বুধবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, আর ২০২৪ সালের আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সেই স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষা করা। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের অবদানও জাতি কখনো ভুলবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাদুঘর উদ্বোধনের দিনটিকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেন তারেক রহমান। তার ভাষ্য, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বহু মানুষ গুম, অপহরণ, নির্যাতন, হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। অনেককে বছরের পর বছর ঘরছাড়া থাকতে হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু নিহত হন এবং কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ আহত হন। এ সময় আন্দোলনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাদের পরিবার এবং আহতদের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোসহ ব্যাপক সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল। তার মতে, ওই শাসনামলে গুম, খুন ও অপহরণকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশে পরিণত করা হয়েছিল।
এ প্রেক্ষাপটে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জনগণের সাহস, আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধের ইতিহাস তুলে ধরবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তৎকালীন শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চিত্রও জাদুঘরের মাধ্যমে সামনে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
তারেক রহমান বলেন, এই জাদুঘর জনগণের সংগ্রাম, বেদনা, সাহস, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ। এটি শুধু ২০২৪ সালের ঘটনাবলির স্মারক হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাসও তুলে ধরা উচিত।
দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রামের তথ্য জাদুঘরে সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছিল। পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এ ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনাও জাদুঘরে স্থান পাওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
জাদুঘরে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিচয় ও জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক ও ডিজিটাল উপাদান সংরক্ষণের আহ্বান জানান তারেক রহমান।
ব্যক্তিগত স্মারক, দলিল, ছবি ও শিল্পকর্ম জাদুঘরে দেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। ইতিহাস উপস্থাপনের ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান পরিহারের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য ইতিহাসকে শক্তিশালী না করে বরং এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হতে পারে। তাই জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রতিটি তথ্যের সত্যতা যথাসম্ভব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জাদুঘরের তথ্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায় উপস্থাপনের পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বিদেশি দর্শনার্থী ও বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতের বিচার প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, প্রতিটি ঘটনার বিচার পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে। বিচার প্রক্রিয়া প্রতিহিংসামূলক না হয়ে আইন অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে।
তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে প্রতিটি অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সহায়তার তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে তাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের মধ্যে ১৩ হাজারের বেশি ব্যক্তিকে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে দেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনে নিহত ও আহতদের রাষ্ট্রীয় সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, সরকার শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রাখছে না। শহীদদের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তেও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
তারেক রহমান জানান, দেশ পুনর্গঠনে ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার এবং জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ পর্যায়ক্রমে নেওয়া হয়েছে।
গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় সংসদে গঠিত ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি। একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শহীদদের প্রত্যাশা পূরণ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অপ্রয়োজনীয় ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড পতিত ও পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের সুযোগ তৈরি করছে কি না, তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত স্থপতি, ইতিহাসবিদ, গবেষক, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ, শিল্পী, সংগ্রাহক, কারিগর, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সহযোগীদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
শহীদ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। পরে তিনি ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন