সম্প্রতি ভারত ও জার্মানি প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের 'প্রজেক্ট-৭৫(আই) সাবমেরিন চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে । এই চুক্তিটি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে বিবেচিত । দীর্ঘ আলোচনার পরে চলতি বছরের মার্চে আনুষ্ঠানিক ভাবে এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে, যা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় এক অন্য মাত্রা যোগ করবে।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই 'প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া (পি-৭৫আই)' প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ভারতের পুরোনো হয়ে যাওয়া সাবমেরিন বহরের সমস্যার সমাধান করা। একই সঙ্গে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও পাকিস্তানের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবিলায় ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামুদ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
পি-৭৫আই সাবমেরিন প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৭২ হাজার কোটি রুপি (৮০০ কোটি ডলার)। এটি ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের সঙ্গে ৩৬টি রাফাল যুদ্ধবিমান ক্রয়ের ৫৮ হাজার কোটি রুপির চুক্তিকেও ছাড়িয়ে যাবে।
এই চুক্তির আওতায় ছয়টি উন্নতমানের প্রচলিত (কনভেনশনাল) ডিজেল-ইলেকট্রিক অ্যাটাক সাবমেরিন তৈরি করা হবে।
নির্বাচিত 'টাইপ-২১৪ নেক্সট-জেনারেশন' সাবমেরিনগুলোতে থাকবে প্রমাণিত ফুয়েল-সেল-ভিত্তিক এয়ার-ইন্ডিপেনডেন্ট প্রোপালশন (এআইপি) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির ফলে সাবমেরিনগুলো মাত্র কয়েক দিনের পরিবর্তে সপ্তাহের পর সপ্তাহ পানির নিচে থাকতে পারবে, যা শত্রুপক্ষের শনাক্ত করার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে।
জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (টিকেএমএস)-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে ভারতের মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (এমডিএল) কৌশলগত অংশীদারিত্বের মডেলে দেশীয়ভাবে এই সাবমেরিনগুলো তৈরি করবে। 'মেক-ইন-ইন্ডিয়া' উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে এই প্রকল্পে ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশ দেশীয়করণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত ১২ ও ১৩ জানুয়ারি জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মারজের ভারত সফরের সময় এই চুক্তির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয় বলে জানা গেছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তিতে সাবমেরিন উৎপাদনের জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
বর্তমানে ভারতীয় নৌবাহিনীতে প্রায় এক ডজন রাশিয়ান এবং ছয়টি নতুন ফরাসি মডেলের সাবমেরিন রয়েছে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল পি-৭৫আই-এর আওতায় ছয়টি সাবমেরিন সংগ্রহের অনুমোদন দেয়। এরপর ২০২১ সালের ২০ জুলাই এআইপি-যুক্ত ছয়টি প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব (আরএফপি) জারি করে।
এই সাবমেরিন প্রকল্প কেবল মূল সাবমেরিন ও জাহাজ নির্মাণশিল্পকেই চাঙ্গা করবে না, বরং সাবমেরিন সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ, সিস্টেম ও সরঞ্জাম তৈরির মাধ্যমে একটি শিল্প ইকোসিস্টেম গড়ে তুলবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) এবং উৎপাদন খাত এতে ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে।
সম্প্রতি ভারত সরকার 'ইন্ডিয়ান নেভাল ইন্ডিজেনাইজেশন প্ল্যান ২০১৫-২০৩০' বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এর আওতায় দেশে বর্তমানে প্রায় ৯০ হাজার কোটি রুপি মূল্যের ৫১টি বড় জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে ভারতীয় শিপইয়ার্ডগুলো নৌবাহিনীকে ৪০টিরও বেশি দেশীয় যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন সরবরাহ করেছে। গত এক বছরে গড়ে প্রতি ৪০ দিনে একটি করে নতুন জলযান নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন