মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা সামনে এলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে কৃষিখাতের আরেক বড় শঙ্কা- সার সংকট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সার আমদানি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তার ওপর এবার আমদানি প্রক্রিয়াও কিছুটা দেরিতে শুরু হয়েছে। বাজেট ঘাটতি ও এলসি জটিলতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে আমদানিকারকদের মধ্যে।
তবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ কারখানাগুলো লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারলে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।
জানা যায়, সরকার যেসব আন্তর্জাতিক কোম্পানির কাছ থেকে ইউরিয়া ও অন্যান্য সার আমদানি করত, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেই প্রক্রিয়া এখন অনিশ্চয়তার মুখে। এ অবস্থায় বেসরকারি পর্যায়ে ২ লাখ টন ইউরিয়া আমদানির লক্ষ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে সরকারের তহবিল স্বল্পতার কারণে সময়মতো আমদানি সম্পন্ন করা যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক মাস ধরে জ্বালানি সংকটের যে চিত্রটি বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও জ্বালানির জন্য সাধারণ মানুষের অপেক্ষা। কিন্তু এর চেয়েও বড় সংকট তৈরি হতে পারে কৃষিখাতে। সময়মতো সার ও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, বাড়বে খাদ্যদ্রব্যের দাম, ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়বে।
জানা গেছে, গ্যাসের ঘাটতির কারণে দেশের ইউরিয়া সার কারখানাগুলোর মধ্যে গড়ে মাত্র একটি চালু থাকে। এরই মধ্যে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার কোম্পানি চালু রেখে শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে দেশের মোট চাহিদার বড় অংশ এখনো আমদানিনির্ভর। বৈশ্বিক সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই আমদানি আরও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এছাড়াও দেশে সেচের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। লক্ষাধিক গভীর ও অগভীর নলকূপ এবং সেচপাম্প ডিজেলে চলে। উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা ইতোমধ্যেই জ্বালানি সংকটে পর্যাপ্ত ডিজেল পাচ্ছেন না। এতে বোরো ধানের সেচ ব্যাহত হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহারের কারণে সেচব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে সরকারি দামের চেয়েও বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে একদিকে কৃষকের লাভ কমছে, অন্যদিকে খাদ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ইউরিয়ার চাহিদা বেশি হলেও বর্তমানে মাত্র একটি ইউরিয়া সার কারখানা চালু আছে। সার ও সেচ সংকট তৈরি হলে উৎপাদন কমবে, খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে।
অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য চাপ বিবেচনায় সরকার দেশের সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহে রেশনিং বা নিয়ন্ত্রিত বণ্টন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আওতায় দেশের তিনটি বড় সার কারখানাকে রেশনিংয়ের মধ্যে আনা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থিত শাহজালাল সার কারখানার উৎপাদন গত ৩ এপ্রিল থেকে এক মাসের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৮ মার্চ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় এপ্রিল থেকে জুন-এই তিন মাস রেশনিংয়ের মাধ্যমে উৎপাদন অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে এপ্রিল মাসে ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার পিএলসিতে গ্যাস সরবরাহ চালু রাখতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, শিল্প মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডও এ রেশনিং ব্যবস্থার আওতায় রয়েছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন