জুলাই ও আগস্টে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগে মাইক্রোস্কোপ ও ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গত দুই মাস ধরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে সরকার। চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, থানা, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তের এনএসওয়ান পরীক্ষার কিট পাঠানো হয়েছে। ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরের হাসপাতালগুলোও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব হাসপাতালের নির্ধারিত ব্যবস্থা চালু করা হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে মসজিদের ইমামসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিজ নিজ এলাকার পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তার মতে, শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, লার্ভা ধ্বংসে ব্যবহারের জন্য একটি বিশেষ ট্যাবলেট আগামী সাত দিনের মধ্যে সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জমে থাকা অল্প পানি, ডাবের খোসা ও পরিত্যক্ত টায়ারে এই ট্যাবলেট ব্যবহার করলে লার্ভা দ্রুত ধ্বংস হবে বলে জানান তিনি।
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সতর্কতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, প্লাজমা লিকেজের কারণে অনেক সময় রোগীর মৃত্যু হয়। এ কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে একটি ‘ডেইলি ট্রিটমেন্ট প্রটোকল’ তৈরি করা হচ্ছে। এটি চিকিৎসকদের মোবাইল ফোনে পাঠানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হবে।
হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, কোনো ডেঙ্গু রোগীর জ্বর কমে গেলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে না।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দীর্ঘ ২৫ বছর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে অত্যাধুনিক টেন-হেডেড মাইক্রোস্কোপ যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে ক্যানসার শনাক্তকরণ আরও নির্ভুল ও কার্যকর হবে।
চিকিৎসা শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে মেডিকেল কারিকুলামে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসন ও সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়ে চলছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে উন্নত বিশ্বের চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলানোর ক্ষেত্রে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কিছুটা পিছিয়ে ছিল। বিশেষ করে চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি প্যাথলজি বিভাগে তিন বছর আগে একটি সরকারি মাইক্রোস্কোপ নষ্ট হওয়ার পর নতুন যন্ত্রপাতির বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, হস্তান্তর করা সর্বাধুনিক মাইক্রোস্কোপটির মাধ্যমে এক সিটিংয়েই নির্ভুলভাবে ক্যানসার শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসাসেবায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। হাসপাতালের ডিআই সাপ্লাইয়ে অনিয়ম দূর করতে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া শুরুর কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের পরিচালনা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হাসপাতালটি সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানায় থাকবে। তবে এর ব্যবস্থাপনা হবে আধুনিক ও করপোরেট ধাঁচের।
একটি কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে অলাভজনকভাবে হাসপাতালটি পরিচালনা করা হবে। থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ কিংবা সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের আদলে ওয়ান-স্টপ জরুরি সেবাসহ আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকার হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণ করবে, যাতে সাধারণ মানুষ তুলনামূলক কম খরচে বিশ্বমানের সেবা পেতে পারেন। প্রয়োজনে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর আশা প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে তিনি আরও জানান, আগামী ১০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শন করবেন।
এ সময় স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন এবং উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোসাররাত সুলতানাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন