জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন ‘নীল দল’-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের ব্যানারে থাকা ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকমণ্ডলী’।
একই সঙ্গে এসব ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (২৭ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে এসব দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, গত দেড় দশক ধরে নীল দল আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও মুক্তচিন্তার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির শিক্ষকরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরোধিতা এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়।
এতে বলা হয়, ১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির পরও ১ আগস্ট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নীল দলের শিক্ষকরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী মহলের ষড়যন্ত্রের ক্রীড়নক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে সরকারের পদত্যাগ দাবি করায় সাদা দলের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়।
স্মারকলিপিতে আরও দাবি করা হয়, ৩ আগস্ট আয়োজিত মানববন্ধনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নাশকতার জন্য দায়ী করে বক্তব্য দেন নীল দলের কয়েকজন শিক্ষক। একই রাতে তাদের কয়েকজন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন জানান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি চালানোর সুপারিশ এবং শিক্ষার্থীদের শনাক্ত ও নির্যাতনের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ ও ছাত্রলীগের কাছে সরবরাহের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকারও সমালোচনা করা হয় স্মারকলিপিতে। এতে অভিযোগ করা হয়, ১৫ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার সময় প্রশাসন ও নীল দলের শিক্ষকরা তা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। বরং হামলাকারীদের সহায়তা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, ১৭ জুলাই হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
স্মারকলিপিতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামালের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়। এতে দাবি করা হয়, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তিনি আন্দোলনকারীদের বহিষ্কারের কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
স্মারকলিপিতে গত ১৭ বছরে নীল দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে অভিযোগ করা হয়, সংগঠনটির শিক্ষকরা ভিন্নমতের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের তথ্য ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর কাছে সরবরাহ করেছেন।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ সংস্কৃতির অস্তিত্ব অস্বীকার এবং এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো সাদা দলের শিক্ষকদের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার অভিযোগও করা হয়।
এ ছাড়া ভিন্নমতের শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদে হয়রানি, পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নীল দলের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম অবিলম্বে নিষিদ্ধ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষকমণ্ডলী।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন