পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলের 'দ্বীপ' ইউনিয়ন চরবিশ্বাসের এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা নুরুল হক (নুর) সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
৩৪ বছর বয়সী এই যুবকের বিজয়ের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অসংখ্য বাধাবিপত্তিকে শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হয়েছে। শিকার হতে হয়েছে হামলা ও মামলার।
নুরুল হকের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার চরবিশ্বাস ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য। নুরের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তাঁর মা নিলুফা বেগম মারা যান। তিন ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তিনি চরবিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন।
গ্রাম থেকে শহরে
গ্রাম থেকে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন নুর। ২০১০ সালে এসএসসি পাসের পর তিনি ২০১২ সালে রাজধানীর উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।
এরপর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর পড়ার পর ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি কিছু সময় ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন।
২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন নুরুল হক। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।
আন্দোলন ও রাজনৈতিক উত্থান
২০১৮ সালে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন নুরুল হক। একই বছরে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া ও নুরুল হকের নেতৃত্বে বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকার পল্টনে দলটির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ১০ জুলাই দলটির একাংশের কাউন্সিলে নুরুল হক সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) বিরোধী আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত সমাবেশের নেতৃত্ব দেন নুরুল হক।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা আহত হন। এ ঘটনায় ২৪ ডিসেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা হলে তাঁর কয়েকজন সহকর্মী গ্রেপ্তার হন।
হামলা, মামলা ও নির্যাতন
২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টানা কয়েকটি আন্দোলনে নুরুল হক প্রায় সাতবার হামলার শিকার হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুরুতর আহত হন এবং বিদেশে চিকিৎসা নিতে হয়।
এর আগে ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ দিনের রিমান্ড ও কারাভোগ করেন। ২০২৩ সালে ছাত্র অধিকার পরিষদের সমাবেশে টিএসসি এলাকায় ছাত্রলীগের হামলায় আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এ ছাড়া ২০১৯ সালের ১৪ আগস্ট ঈদ উপলক্ষে নিজ বাড়িতে গেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। এ ছাড়া ডাকসু নির্বাচনকালে রোকেয়া হলের প্রভোস্ট লাঞ্ছিত ও ভাঙচুরের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, নুরুল হকের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৫টি মামলা হয়েছে। তাঁর ছোট ভাই আমিনুল ইসলাম নুর দাবি করেন, এ পর্যন্ত তাঁর ভাই ২৮ বার হামলার শিকার হয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল হক বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী মারিয়া আক্তার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। তাঁদের সংসারে দুই মেয়ে ও এক ছেলে।
নুরের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার (৮০) প্রথম আলোকে বলেন, আশির দশকে লঞ্চডুবিতে তাঁর দুই মেয়ে মারা যায়। পরে নব্বইয়ের দশকে নুরের মা নিলুফা বেগমের মৃত্যু হয়। এত শোকের মধ্যেও তিনি নুরকে ঢাকায় পড়াশোনার ব্যবস্থা করেন।
স্বপ্ন ছিল ছেলে চিকিৎসক হবে। রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ছেলে যখন হামলা-মামলার শিকার হয়ে কারাগারে যেতেন, তখন অনেক রাত তিনি ঘুমাতে পারেননি। এত শঙ্কা যে সন্তানকে নিয়ে, সে এমপি হবে; এটা কখনো ভাবেননি তিনি।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন