ইউরোপ কোনো ধরনের হুমকি, ভয়ভীতি কিংবা জবরদস্তির কাছে মাথা নত করবে না—এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ। গ্রিনল্যান্ড দখলের অনুমতি না দেয়ায় ইউরোপের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে দেওয়া ভাষণে মাক্রোঁ এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, “আমরা জবরদস্তির চেয়ে সম্মানকে এবং পাশবিক শক্তির চেয়ে আইনের শাসনকে বেশি গুরুত্ব দিই।” ইউরোপ কখনোই ‘শক্তিশালী পক্ষের আইন’ নিঃশর্তভাবে মেনে নেবে না উল্লেখ করে মাক্রোঁ বলেন, তা করলে ইউরোপ কার্যত পরাধীন বা ‘ভ্যাসাল’ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
বিশ্ব যখন ক্রমেই একটি নিয়মহীন ও অস্থিতিশীল ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখনও ইউরোপ আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
প্রয়োজনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) পাল্টা কঠোর বাণিজ্যিক ব্যবস্থা নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। তিনি ইইউর তথাকথিত ‘অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট’-এর কথা উল্লেখ করেন, যা অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘ট্রেড বাজুকা’ নামে পরিচিত। এই ব্যবস্থার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইউরোপীয় সরকারি টেন্ডারে প্রবেশাধিকার সীমিত করা কিংবা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মসহ বিভিন্ন পরিষেবা খাতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।
মাক্রোঁ বলেন, “ওয়াশিংটনের নতুন নতুন শুল্ক আরোপের এই অন্তহীন প্রবণতা মৌলিকভাবে অগ্রহণযোগ্য—বিশেষ করে যখন এসব শুল্ক আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।”
এর আগে গত শনিবার ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ফ্রান্সসহ কয়েকটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের ওপর ধাপে ধাপে শুল্ক আরোপ করা হবে। গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলবে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের এ ঘোষণাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ দেশগুলো ‘ব্ল্যাকমেইল’ বা অনৈতিক চাপ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনার জন্য আগামী বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের একটি বিশেষ শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাক্রোঁর পাঠানো একটি ব্যক্তিগত বার্তার স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন। ফরাসি কর্মকর্তাদের মতে, এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারের গুরুতর লঙ্ঘন। ওই বার্তায় গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে বিভ্রান্তির কথা তুলে ধরে একটি জি-৭ সম্মেলনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন মাক্রোঁ।
মাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন, দাভোসে ট্রাম্প উপস্থিত থাকলেও তার সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, “আমার সফরসূচি অনেক আগেই নির্ধারিত ছিল। সেটি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই।”
২০১৭ সাল থেকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইমানুয়েল মাক্রোঁ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক শুরু থেকেই ওঠানামাপূর্ণ। কখনো সৌহার্দ্য, কখনো প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব—এই দুই নেতার সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
মাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণেই তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের চাপের মুখে পড়ছেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন