দেশে শিশু জন্মের সময় অপ্রয়োজনে অস্ত্রোপচার বা সিজারিয়ান পদ্ধতিতে ডেলিভারির হার দ্রুত বাড়ছে-যা পরিবার ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে বছরে প্রায় ৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।
গত বছর দেশে প্রায় ১৭ লাখ নারী সিজারিয়ান পদ্ধতিতে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। বর্তমানে দেশে হাসপাতালভিত্তিক মোট প্রসবের ৭৯ শতাংশই সিজারিয়ানের মাধ্যমে হচ্ছে-যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে সিজারিয়ানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত 'রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশনস ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আশুলিয়া উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ) এই সভার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞরা জানান, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রমাণভিত্তিক প্রসব পদ্ধতি অনুসরণে অনীহা এবং স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ব্যাপক ভয়-অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের প্রধান কারণ। সভায় এ বিষয়ে চারটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণাগুলোর একটি উপস্থাপন করতে গিয়ে আশুলিয়া উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের (এডব্লিউসিএইচ) প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের অধ্যাপক আনজুমান আরা রীতা ২০১৯ সালের সেভ দ্য চিলড্রেনের একটি প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের তুলনায় সিজারিয়ান ডেলিভারির খরচ প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। তিনি বলেন, "শুধু ২০১৮ সালেই বাংলাদেশে সিজারিয়ান ডেলিভারিতে প্রায় ৪৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় হয়েছে-যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।"
তিনি আরও বলেন, অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কার্যত অস্ত্রোপচারনির্ভর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে রোগীর নিরাপত্তার চেয়ে টাকাকেই বড় করে দেখা হয়। এর ফলে জনমনে স্বাভাবিক প্রসবকে ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রসবের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া উপেক্ষিত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়ভাবে আগেভাগেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
সিজারিয়ান পদ্ধতিতে জন্মদান কমিয়ে আনার উপায়
আশুলিয়া উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের (এডব্লিউসিএইচ) অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক আনজুমান আরা রীতা বলেন, শক্তিশালী ক্লিনিক্যাল গভর্ন্যান্স এবং মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন সেবা মডেলের মাধ্যমে নিরাপদভাবে অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমানো সম্ভব। তিনি জানান, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এডব্লিউসিএইচে সিজারিয়ানের হার ছিল ৫৮ থেকে ৭৩ শতাংশের মধ্যে। পরে একটি অপারেশনাল রিসার্চ কর্মসূচির আওতায় ১১টি প্রমাণভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এর মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কাউন্সেলিং, রবসন শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি প্রয়োগ, প্রসব পর্যবেক্ষণ জোরদার, কনসালট্যান্ট অডিট এবং ভিবিএসি (সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব) সুবিধা চালু উল্লেখযোগ্য। এর ফলে হাসপাতালে সিজারিয়ানের হার কমে ৪২ শতাংশে নেমে আসে-যা আপেক্ষিকভাবে প্রায় ২০ শতাংশ হ্রাস বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক রীতা বলেন, গেটস ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে ২০২২-২৩ সালে আটটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এই মডেল সম্প্রসারণ করা হলে মিশ্র ফল পাওয়া যায়। এর মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান সিজারিয়ানের হার ২৫ শতাংশ বা তার বেশি কমাতে সক্ষম হয়। তিনি বলেন, "শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই যথেষ্ট নয়। নেতৃত্বের জবাবদিহি, কার্যকর গভর্ন্যান্স, মিডওয়াইফ-নেতৃত্বাধীন সেবা মডেল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুতি-এই সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে।"
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা উপেক্ষা
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে আশুলিয়া উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন হাসপাতালের (এডব্লিউসিএইচ) গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, মা ও নবজাতক স্থিতিশীল থাকলে প্রসবের প্রাথমিক বা ল্যাটেন্ট ধাপ দীর্ঘ হওয়া সিজারিয়ান করার কোনো কারণ হতে পারে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) এর সঙ্গে একমত। তিনি বলেন, "প্রসবের জন্য সময় প্রয়োজন। নবজাতকের মস্তিষ্কের প্রায় ৭০ শতাংশ আঘাত প্রসব শুরুর আগেই ঘটে, আর ১০ শতাংশেরও কম আঘাত ঘটে কেবল প্রসবকালীন সময়ে।" তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে মাতৃদেহের মাইক্রোবায়োম নবজাতকের শরীরে স্থানান্তরিত হয়-যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে সহায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় ও রোগপ্রতিরোধজনিত ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।
নিয়িমনীতি জোরদারের আহ্বান
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিচালক (ক্লিনিকস) ডা. মইনুল আহসান বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান কমাতে সিনিয়র স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্ব নিতে হবে। তিনি বলেন, "বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কার্যকর লেবার রুম থাকতে হবে। লেবার রুম ছাড়া কোনো বেসরকারি হাসপাতালকে লাইসেন্স দেওয়া হবে না।"
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যসচিব সায়েদুর রহমান বলেন, অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান প্রতিরোধে গর্ভধারণের শুরু থেকেই মা ও নবজাতকের দায়িত্বশীল ফলোআপ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি বলেন, "জনবল সংকট কোনো অজুহাত হতে পারে না। আমাদের কমিউনিটি পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে এবং প্রতিটি অন্তঃসত্ত্বা নারীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।" তিনি বলেন, কার্যকর নীতিনির্ধারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সিজারিয়ান ও স্বাভাবিক প্রসবসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত তথ্য থাকা জরুরি। স্বাস্থ্যসচিব আরও সতর্ক করে বলেন, অনেক ক্লিনিকে স্বাভাবিক প্রসব, শিশু চিকিৎসা ও অ্যানেস্থেশিয়া সেবার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই-যা মা ও নবজাতকের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
হাসপাতাল লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তিনি বলেন, লেবার রুম ও মাতৃসেবার ন্যূনতম মান কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, দেশের ৭০ শতাংশের বেশি বেসরকারি মাতৃসেবা কেন্দ্র কার্যত কোনো কার্যকর তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।
এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি সেবা ও মানসম্মত লেবার রুম নেই। ফলে মুনাফাভিত্তিক, অস্ত্রোপচারনির্ভর প্রসব ক্রমেই বাড়ছে-যা মা ও নবজাতককে অপ্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে ফেলছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন