আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি প্রদান করেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তবে তার জবানবন্দি সম্পূর্ণ না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী সোমবার দিন ধার্য করেন। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, শুনানির শুরুতে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম মামলার সূচনা বক্তব্য (ওপেনিং স্টেটমেন্ট) উপস্থাপন করেন। এরপর সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় দাঁড়ান সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি তার জবানবন্দিতে সেনাবাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরে গুম ও হত্যার সংস্কৃতি কীভাবে গড়ে ওঠে, সে বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি র্যাব সম্পর্কেও তিনি বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
জবানবন্দিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়কালে ডিজিএফআই একটি প্রভাবশালী নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়। ওই সময় বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে এনে নিজেদের সেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো, যাদের মধ্যে মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও ছিলেন। এমনকি তারেক রহমানকেও তুলে এনে অমানবিক নির্যাতন করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন,বেসামরিক ব্যক্তিদের ডিজিএফআইয়ের সেলে আটক রাখার বিষয়টি এক সময় নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। এর ফলে বাহিনীগুলোর মধ্যে এমন এক মানসিকতা তৈরি হয় যে, কাউকে তুলে এনে যেকোনো কিছু করা সম্ভব—এই মনস্তাত্ত্বিক বাধা ভেঙে পড়ে।
জবানবন্দিতে ২০০৩ সালের ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর প্রসঙ্গ টেনে সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, র্যাব গঠনের আগে ওই অভিযানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় হার্ট অ্যাটাকে ১২ জনের মৃত্যু হয়। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে এই সংখ্যা ছিল অন্তত ৬০ জন। পরবর্তীতে অভিযানে জড়িতদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়, যা কার্যত ‘লাইসেন্স টু কিল’ হিসেবে কাজ করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রোববার সকালে মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান-কে কড়া নিরাপত্তায় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন নাহার।
শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে আইনজীবী নাজনীন নাহার বলেন, সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দি এখনও অসম্পূর্ণ। তিনি দাবি করেন, জবানবন্দিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দীর্ঘ ইতিহাস ও ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে, যা একজন সাবেক সেনাপ্রধানের কাছ থেকে তিনি প্রত্যাশা করেননি। তার ভাষায়, সেনাবাহিনী একটি গৌরবময় প্রতিষ্ঠান, যা দেশ গঠন ও সংকটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, জবানবন্দি শেষ হওয়ার পর প্রতিরক্ষা পক্ষ এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানাবে।
উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০১১ সালের ১১ জুলাই পুবাইলে তার উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যা এবং একই সময়কালে আরও সমসংখ্যক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে আজ এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হলো।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন