সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে সংস্কারের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় এসেছে। তবে মোট ভোটদানের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা দেশে অতীতে অনুষ্ঠিত তিনটি গণভোটের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ দুই হাজার ৩৩৪ ভোটারের মধ্যে গণভোটে অংশ নেন সাত কোটি ৬৯ লাখ ৫১ হাজার ৩৮২ জন। এর মধ্যে বৈধ ভোট হিসেবে গণনা করা হয়েছে ছয় কোটি ৯২ লাখ ৩০ হাজার ২৯৬টি। বাতিল হয়েছে ৭৭ লাখ ২১ হাজার ৮৬টি ভোট।
বৈধ ভোটের মধ্যে ‘হ্যাঁ’ পেয়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোট (৬৮ দশমিক ০৫ শতাংশ)। ‘না’ পেয়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট, যা মোট বৈধ ভোটের প্রায় ৩২ শতাংশ।
এর আগে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে সংবিধানের নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ সংশোধন, রাষ্ট্রপতির পদে থাকা-না থাকা এবং সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেসব গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সর্বনিম্ন ভোট পড়েছিল ৮৪ শতাংশ।
কী ছিল গণভোটের প্রশ্ন
এবারের গণভোটের ব্যালটে প্রশ্ন ছিল—“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন জুলাই জাতীয় সনদে একমত হওয়া বিষয়গুলোর আলোকে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সংস্কার বাস্তবায়ন করবেন এমপিরা
সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ সদস্যরা অধিবেশন শুরুর পরবর্তী ১৮০ দিন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী দল বাধ্য থাকবে—গত নভেম্বরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এমনটাই জানিয়েছিলেন প্রধান উপদেষ্টা।
যেসব পরিবর্তন আসছে
বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—যতবার নির্বাচিতই হন না কেন। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ সংশোধনের পথ খুলে গেল।
এ ছাড়া নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন।
সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং প্রয়োজনে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিধান যুক্ত হবে। সংসদ সদস্যদের ভোটদানের স্বাধীনতা বাড়ানো এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির প্রস্তাবও রয়েছে।
সংবিধান সংস্কারের আরেকটি বড় প্রস্তাব হলো দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে।
আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষের আসন বণ্টন হবে। কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে মোট ভোটের ১ শতাংশের কম পেলে তারা উচ্চকক্ষে প্রতিনিধিত্ব পাবে না।
উচ্চকক্ষ সরাসরি আইন প্রণয়ন করতে পারবে না। তবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নিম্নকক্ষকে সুপারিশ করতে পারবে। নিম্নকক্ষে পাস হওয়া সব বিল (অর্থবিল ও আস্থা ভোট ছাড়া) অনুমোদনের জন্য উচ্চকক্ষে যাবে। দুই মাসের বেশি বিল আটকে রাখলে তা অনুমোদিত বলে গণ্য হবে। তবে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন বাধ্যতামূলক থাকবে।
গণভোটের এই রায়ের মাধ্যমে দেশে একটি নতুন সাংবিধানিক কাঠামোর পথে যাত্রা শুরু হলো বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন