বাবা- মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ । কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নির্ভরতা, নিরাপত্তা, ত্যাগ, শাসন, সাহস এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার অসংখ্য গল্প। পরিবারের সবার মুখে হাসি ধরে রাখতে যিনি নিজের কষ্ট আড়াল করেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে যিনি নিরলস পরিশ্রম করেন, আজ সেই মানুষটির প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন।
আজ রোববার, ২১ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বাবা দিবস। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বিশ্বের অনেক দেশে প্রতিবছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার দিবসটি উদ্যাপন করা হয়। ২০২৬ সালে দিনটি পড়েছে ২১ জুন।
বাবা দিবস কোনো একটি বিশেষ উপহার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দিনটি সন্তানের জীবনে বাবার অবদান, ত্যাগ এবং পথনির্দেশনাকে নতুন করে উপলব্ধি করার সুযোগ এনে দেয়।
বাবা দিবসের ইতিহাস
আধুনিক দিনে বাবা দিবসের প্রচলনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সোনোরা স্মার্ট ডডের নাম বিশেষভাবে জড়িত। তার বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট ছিলেন একজন গৃহযুদ্ধের প্রবীণ সৈনিক। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি একাই সোনোরা ও তার পাঁচ ভাইবোনকে লালন-পালন করেছিলেন।
১৯০৯ সালে মা দিবসের একটি অনুষ্ঠান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সোনোরা মনে করেন, সন্তানদের জন্য বাবাদের ত্যাগ ও অবদানকে সম্মান জানাতেও একটি বিশেষ দিন থাকা প্রয়োজন। তার প্রচেষ্টায় ১৯১০ সালের ১৯ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের স্পোকেনে প্রথম আনুষ্ঠানিক বাবা দিবস পালিত হয়।
এরও আগে ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় একটি খনি দুর্ঘটনায় নিহত বাবাদের স্মরণে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে বাবা দিবসকে নিয়মিত জাতীয় দিবসে পরিণত করার আন্দোলনের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে সোনোরা স্মার্ট ডডকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
১৯২৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ বাবা দিবস পালনের উদ্যোগে সমর্থন জানান। ১৯৬৬ সালে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। পরে ১৯৭২ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের স্বাক্ষর করা আইনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি স্থায়ী জাতীয় স্বীকৃতি পায়।
বাবা মানেই ছায়া ও সাহস
বাবার ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ্য নয়। তিনি হয়তো মুখে বারবার ভালোবাসার কথা বলেন না, কিন্তু সন্তানের প্রয়োজন পূরণের জন্য নিজের প্রয়োজনকে পিছিয়ে দেন। সন্তানের ব্যর্থতায় সাহস জোগান, সাফল্যে নীরবে গর্ব করেন এবং কঠিন সময়ে শক্ত হয়ে পাশে দাঁড়ান।
একজন বাবা সন্তানের প্রথম দিকনির্দেশক। কীভাবে দায়িত্ব নিতে হয়, প্রতিকূলতার সামনে দাঁড়াতে হয় এবং সততার সঙ্গে জীবনযাপন করতে হয়-এসব মূল্যবোধের অনেকটাই সন্তান বাবার কাছ থেকে শেখে।
সব ধর্মে বাবার সন্তুষ্টির কথা বলা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে আছে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি বাবার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি বাবার অসন্তুষ্টিতে নিহিত।’ সনাতন ধর্মমতে, ’পিতা স্বর্গ, পিতাই ধর্ম, পিতাই পরম তপস্যা। পিতাকে খুশি করলে সব দেবতা খুশি হন।’
শুধু একটি দিনের ভালোবাসা নয়
ব্যস্ত জীবনে অনেক সন্তানই বাবার সঙ্গে মনের কথা বলার সময় পান না। কেউ কর্মসূত্রে দূরে থাকেন, কেউ আবার একই বাড়িতে থেকেও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না। বাবা দিবস সেই দূরত্ব কমানোর একটি উপলক্ষ হতে পারে।
দামি উপহারই যে বাবাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেবে, এমন নয়। একটি ফোনকল, হাতে লেখা ছোট্ট চিঠি, একসঙ্গে কিছু সময় কাটানো কিংবা আন্তরিকভাবে “তোমাকে ধন্যবাদ” বলাও তার কাছে বড় উপহার হয়ে উঠতে পারে।
যাদের বাবা আর পৃথিবীতে নেই, তাদের জন্য দিনটি স্মৃতি ও শূন্যতার। বাবার শেখানো কথা, তার সঙ্গে কাটানো সময় এবং জীবনে রেখে যাওয়া মূল্যবোধ স্মরণ করেই তারা দিনটি পালন করেন।
বাবা দিবসের এই দিনে পৃথিবীর সকল বাবার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সন্তানের স্বপ্ন পূরণে যারা নীরবে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন, পরিবারের নিরাপত্তা ও সুখের জন্য নিরলস পরিশ্রম করেন তাদের প্রত্যেককে বাবা দিবসের শুভেচ্ছা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন