পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ঐতিহ্য, তারকা কিংবা সামর্থ্য—সবদিক থেকেই যেকোনো টুর্নামেন্টে শিরোপার অন্যতম দাবিদার তারা। তবে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। মহাদেশীয় ফুটবলেও আগের সেই আধিপত্য নেই। হারানো গৌরব ফিরে পেতে এবার নতুন পথেই হাঁটছে সেলেসাওরা।
ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের প্রথা ভেঙে দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিদেশি কোচ কার্লো আনচেলত্তিকে। রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক এই ইতালিয়ান কোচের হাত ধরে চলমান বিশ্বকাপে ষষ্ঠ শিরোপা বা ‘হেক্সা’ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন ব্রাজিল সমর্থকেরা।
আনচেলত্তির অধীনে এবার নকআউট পর্বের লড়াইয়ে নামছে ব্রাজিল। প্রতিপক্ষ এশিয়ার শক্তিশালী দল জাপান। ম্যাচটি একদিকে যেমন ব্রাজিলের জন্য প্রতিশোধের, অন্যদিকে আনচেলত্তির অধীনে দলটি কতটা পরিণত হয়েছে, সেটি প্রমাণেরও বড় পরীক্ষা।
পুরোনো হারের প্রতিশোধের সুযোগ
২০২৫ সালের অক্টোবরে টোকিওতে অনুষ্ঠিত এক প্রীতি ম্যাচে জাপানের কাছে ৩-২ গোলে হেরেছিল ব্রাজিল। ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল হজম করে সেলেসাওরা। ব্রাজিলের বিপক্ষে ১৪ বারের মুখোমুখি লড়াইয়ে সেটিই ছিল জাপানের প্রথম জয়।
ওই হার আনচেলত্তির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জের গভীরতাও তুলে ধরেছিল। একটি অগোছালো দলকে বিশ্বকাপের শিরোপার দাবিদার হিসেবে গড়ে তুলতে মাত্র এক বছর সময় পেয়েছিলেন তিনি।
আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্রাজিল দল নড়বড়ে অবস্থায় ছিল। চারজন ভিন্ন কোচের অধীনে খেলে দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে পঞ্চম হয়েছিল তারা, যা ছিল দলটির ইতিহাসের অন্যতম বাজে পারফরম্যান্স।
বিশ্বকাপের ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত দল ঘোষণার আগে খেলোয়াড়দের পরখ করতে মাত্র পাঁচটি আন্তর্জাতিক বিরতি পেয়েছিলেন আনচেলত্তি। শেষ তিনটি বিরতিতে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দলের বিপক্ষে ব্রাজিলকে খেলিয়েছেন তিনি। লক্ষ্য ছিল ফুটবলারদের ভিন্ন ধরনের ফুটবল কৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
এশিয়া সফরের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। সিউলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-০ গোলে হারানোর পর টোকিওতে জাপানের বিপক্ষেও আধঘণ্টার মধ্যে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় তুলে নেয় জাপান।
বদলে যাওয়া দুই দল
হিউস্টনের নকআউট ম্যাচটি আগের সেই প্রীতি ম্যাচের তুলনায় ভিন্ন আবহে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গ্রুপ পর্বে সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে নেদারল্যান্ডসের পেছনে দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউট নিশ্চিত করেছে জাপান।
জাপানের কোচ হাজিমে মরিয়াসু বলেন, ‘হয়তো আগের জয়ের কারণে তারা এবার আরও বেশি অনুপ্রাণিত থাকবে। আমরা এমন এক ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যারা জয়ের জন্য মরিয়া। আমি ম্যাচটির দিকে তাকিয়ে আছি।’
তবে আগের ম্যাচে ব্রাজিলকে হারানো জাপান দলে এবার বেশ কয়েকটি পরিবর্তন থাকছে। চোটের কারণে অধিনায়ক ওয়াতারু এন্দো, উইঙ্গার কাওরু মিতোমা ও তাকেফুসা কুবো এবং গত অক্টোবরের ম্যাচে গোল করা ফরোয়ার্ড তাকুমি মিনামিনোকে পাচ্ছেন না মরিয়াসু।
ব্রাজিল দলেও এসেছে বড় পরিবর্তন। টোকিওর ম্যাচে খেলা রক্ষণভাগের কোনো ফুটবলারকেই এবারের বিশ্বকাপ দলে রাখেননি আনচেলত্তি।
মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে বিশ্বকাপ শুরু করলেও পরে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে ব্রাজিল। টানা দুই জয়ে দলের আত্মবিশ্বাস এখন তুঙ্গে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়র করেছেন চার গোল। দীর্ঘ তিন বছরের চোট-সংগ্রাম কাটিয়ে জাতীয় দলে ফিরেছেন নেইমারও।
অতিরিক্ত সময় ও পেনাল্টির প্রস্তুতি
নকআউট ম্যাচের আগে আত্মবিশ্বাসী থাকলেও জাপানকে হালকাভাবে নিচ্ছেন না আনচেলত্তি। গ্রুপ পর্বের মতো নকআউটে ভুল সংশোধনের সুযোগ নেই বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
আনচেলত্তি বলেন, ‘নকআউট পর্বে যেকোনো কিছুই হতে পারে। অতিরিক্ত সময় এবং পেনাল্টি—সব দিক মাথায় রেখেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি। এই ধরনের ম্যাচে শুধু পা নয়, মস্তিষ্ক ও হৃদয় দুটোকেই সচল রাখতে হবে। এটি এক লেগের ম্যাচ, তাই ছিটকে গেলে আর ফেরার পথ নেই। তবে আমার খেলোয়াড়েরা বুদ্ধিমান। তারা জানে চাপ কীভাবে সামলাতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পুরো দল মনোযোগী এবং সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। অতিরিক্ত সময় কিংবা পেনাল্টি শুটআউট—সবদিক থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ম্যাচটি আমাদের কাছে ফাইনালের মতো।’
আনচেলত্তির হাই প্রেসিং কৌশল
আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের খেলায় বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো প্রতিপক্ষের অর্ধে তীব্র চাপ সৃষ্টি করে দ্রুত বল পুনরুদ্ধার করা।
নিজেদের অর্ধে নেমে রক্ষণ সামলানোর পরিবর্তে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও মাতেউস কুনহারা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে চাপ প্রয়োগ করছেন। উদ্দেশ্য, প্রতিপক্ষকে ভুল করতে বাধ্য করা এবং বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত আক্রমণে যাওয়া।
আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিলের ৩৩ গোলের মধ্যে আটটি এসেছে প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে বল কেড়ে নেওয়ার পর। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চারটি গোলের একটি এসেছে হাই প্রেসিংয়ের মাধ্যমে।
স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচেও এই কৌশলের কার্যকারিতা দেখা গেছে। ব্রাজিলের প্রথম দুটি গোলই এসেছে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল পুনরুদ্ধারের পর। একই ধরনের পরিস্থিতিতে আরও একটি গোল করেছিলেন ভিনিসিয়ুস, যদিও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সিদ্ধান্তে সেটি বাতিল হয়।
অনুশীলনেও বল পুনরুদ্ধার ও দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন আনচেলত্তি। ম্যাচ-পূর্ব ভিডিও বিশ্লেষণ ও কৌশলগত আলোচনায়ও বিষয়টি নিয়মিত তুলে ধরা হচ্ছে।
জাপানের ফুটবল উন্নয়নে জিকোর ভূমিকা
ব্রাজিল ও জাপানের লড়াইয়ের পেছনে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক সংযোগও। জাপানের ফুটবল উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি জিকো।
ফ্ল্যামেঙ্গো, উদিনেস ও ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে খেলার পর অবসর ভেঙে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত জাপানের সুমিতোমো মেটালে খেলেন তিনি। ক্লাবটি পরে কাশিমা অ্যান্টলার্স নামে পরিচিতি পায়। জিকোর উপস্থিতি জাপানে পেশাদার ফুটবলের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
পরে কাশিমার কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন জিকো। বর্তমানে তিনি ক্লাবটির টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে যুক্ত আছেন।
২০০২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জাপান জাতীয় দলের প্রধান কোচ ছিলেন জিকো। তার অধীনে ২০০৪ সালে এশিয়ান কাপ জেতে জাপান এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। তবে ওই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলের কাছে ৪-১ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছিল জাপান।
এবার সেই জাপানই ব্রাজিলের নকআউট পর্বের বাধা। পুরোনো হারের প্রতিশোধ, আনচেলত্তির কৌশলের পরীক্ষা এবং ষষ্ঠ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন-সব মিলিয়ে ম্যাচটি সেলেসাওদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষার মঞ্চ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন