সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার রাতে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তবে ‘সংবিধান সংশোধন পরিষদ’ গঠনের দাবি জানিয়ে কমিটিতে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দেয় বিরোধী দল। পরে তারা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে।
বিরোধী দলের সদস্যদের নাম না থাকায় প্রাথমিকভাবে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সদস্যদের নাম দেওয়া হলে তাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশেষ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, জয়নাল আবেদিন, মোহাম্মদ জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, আন্দালিব রহমান পার্থ, মোহাম্মদ নুরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমিন, সাকিলা ফারজানা, মোহাম্মদ মাহমুদুল হক রুবেল ও মোহাম্মদ অলিউল্লাহ।
কমিটি গঠনের প্রস্তাবের পর বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথম অধিবেশনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং তখনই বিরোধী দল তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছিল।
তিনি বলেন, এরপর কয়েক দফা যোগাযোগ ও বৈঠক হলেও বিরোধী দল কখনো এই কমিটির জন্য সদস্যদের নাম দেওয়ার কথা জানায়নি। নীতিগতভাবে প্রস্তাবটি গ্রহণ না করায় তারা কমিটিতে অংশ নিচ্ছে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সব দল গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, তারা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নিয়েছেন। বিরোধী দল মনে করে, দুটি শপথই বহাল ও কার্যকর রয়েছে। সংস্কার পরিষদকে এড়িয়ে সংসদীয় কমিটি গঠন করা হলে তারা তা প্রত্যাখ্যান করবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণতন্ত্রের মূল দাবি জনগণের মতামত মেনে নেওয়া। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ যে রায় দিয়েছেন, তা উপেক্ষা করা হলে মানুষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাতে পারে।
জনগণের রায়কে সম্মান না জানানোর প্রতিবাদে বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নেওয়ার পাশাপাশি সংসদ থেকে ওয়াকআউটের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
পরে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বিরোধী দল যে যুক্তিতে ওয়াকআউট করেছে, তা তাদের বিবেচনায় সঠিক হতে পারে। তবে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করা।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল না হলে আদালতের রায় থাকলেও দেশকে ওই সংশোধনীর ভিত্তিতেই চলতে হবে। তাই সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন ও সংবিধান সংশোধন ছাড়া নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিরোধীদলীয় নেতার দুটি শপথের বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন এবং সরকারি ও বিরোধী দল সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা করেছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, সংবিধানের কোথায় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আলাদা শপথ নেওয়ার বিধান রয়েছে। তার দাবি, সংসদ সদস্যদের জন্য আলাদা শপথের ফর্ম সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ ও তৃতীয় তফসিলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এর কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
গণভোট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই আদেশ’ বা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংস্কার আদেশ’ নামে যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তা শুরু থেকেই এখতিয়ারবহির্ভূত ছিল। রাজনৈতিক সমঝোতার জুলাই সনদেও উভয় পক্ষের স্বাক্ষর করা এমন কোনো বিষয় ছিল না বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের অধিকাংশ সমঝোতা তারা মেনে নিয়েছেন। তবে এর একটি অংশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করেন।
বিরোধী দলকে সংসদে ফিরে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধন না করে বসে থাকার সুযোগ নেই। তা না হলে পঞ্চদশ সংশোধনীর অধীনেই দেশ পরিচালিত হবে।
তিনি জানান, বিশেষ কমিটি অবিলম্বে কাজ শুরু করবে। বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংসদের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা করা হবে।
সব অংশীজনের সুপারিশের ভিত্তিতে সংসদে ১৮তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। একটি শক্তিশালী সংশোধনী বিল প্রণয়নে বিরোধী দল সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এর আগেও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনা এবং বিরোধী দলের ওয়াকআউটের ঘটনা ঘটেছে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন