বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপরিহার্য বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কমিশন গণমাধ্যমের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ দেখাবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতার সীমারেখাও নির্ধারণ করবে।
সোমবার রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে তথ্য ভবনের ডিএফপি সম্মেলন কক্ষে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বাকশালী শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস’ স্মরণ এবং ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে বহুমতের সহাবস্থান এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জবাবদিহিতার বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে না পারলে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কমিশন গঠন সম্ভব হবে না।
অতীতের উদ্যোগগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, গণমাধ্যমসংক্রান্ত আগের প্রচেষ্টাগুলো ছিল আংশিক এবং সেগুলো কোনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, অতীতে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে একটি প্রেস কমিশন গঠন করা হলেও ওই কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। সেই অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় রেখে একজন সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে নতুন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, কমিশনে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল, সংবাদপত্রের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধি থাকতে পারেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, কমিশন গণমাধ্যমের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি, আইন ও কাঠামো প্রণয়ন করবে। এটি গণমাধ্যমের পেশাগত ও বাণিজ্যিক বিকাশে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করবে এবং অপসাংবাদিকতা ও পেশাগত বিচ্যুতি রোধে কাজ করবে।
যুক্তরাজ্যের ‘অফিস অব কমিউনিকেশনস’, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন’ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের নীতি ও বিধিমালা সংশ্লিষ্ট সবাইকে মেনে চলতে হয়। এর মাধ্যমে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়, তেমনি স্বাধীনতার অপব্যবহার ঠেকাতে দায়িত্বশীলতার সীমাও নির্ধারিত থাকে।
তিনি জানান, জাতীয় সম্পাদক কাউন্সিল, মালিক সমিতি, সম্পাদকদের সংগঠন, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং সংবাদপত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে।
সব পক্ষকে শুরুতেই একই মঞ্চে এনে লক্ষ্য ও কাঠামোর বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা না গেলে অতীতের মতো উদ্যোগটি ব্যর্থ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তথ্যমন্ত্রী।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক ও ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারুফ কামাল খান সোহেল।
মূল প্রবন্ধে মারুফ কামাল খান সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন বাকশাল গঠনের পর চারটি সরকারি পত্রিকা ছাড়া দেশের অন্য সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করা হয়েছিল। ঘটনাটিকে তিনি সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান বলেন, গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা হলো নিজের মত প্রকাশের সুযোগ। কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে লেখার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করা যেতে পারে, তবে শক্তি প্রয়োগ করে কারও কণ্ঠরোধ করা উচিত নয়।
বিগত সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করা এবং জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডকে গণমাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।
যুগান্তর সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক নয়াদিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও কালের কণ্ঠ সম্পাদক কবি হাসান হাফিজ, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরীসহ বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন