বর্তমান জাতীয় সংসদের কার্যক্রমের দিকে দেশের ১৮ কোটি মানুষের দৃষ্টি রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেছেন, জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, গঠনমূলক সমালোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন—এটাই জাতির আশা।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান সংসদকে ‘মজলুমের সংসদ’ আখ্যা দিয়ে কায়সার কামাল বলেন, এর অধিকাংশ সদস্য অতীতে গুম, নির্যাতন, কারাবরণ, নির্বাসন কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তার দাবি, ৩৫০ সংসদ সদস্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে এমন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। এ কারণে বর্তমান সংসদকে বিশ্বের ইতিহাসেও ব্যতিক্রমধর্মী বলে মনে করেন তিনি।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকার বলেন, জাতীয় সংসদের প্রতিদিনের কার্যক্রম এখন গ্রামের কৃষক, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেখছেন। তাই সংসদ সদস্যদের প্রতিটি বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন।
সংসদ পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকা পর্যন্ত তিনি নিরপেক্ষতা ও ন্যায়পরায়ণতা বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকারি ও বিরোধী—উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান কায়সার কামাল। তিনি বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা। সেই লক্ষ্য পূরণে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জাতীয় সংসদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনসভা আইন প্রণয়ন করে, নির্বাহী বিভাগ তা বাস্তবায়ন করে এবং বিচার বিভাগ আইনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে। তাই রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক চর্চাসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কেন্দ্র হওয়া উচিত সংসদ।
কায়সার কামাল বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হচ্ছে সরকারি ও বিরোধী—দুই পক্ষের উপস্থিতি এবং পারস্পরিক গঠনমূলক সমালোচনা। ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, পাকিস্তান ও ভারতের সংসদীয় ব্যবস্থায় আলোচনার মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি নির্ধারিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রত্যাশা পূরণে বর্তমান সংসদ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কায়সার কামাল দাবি করেন, স্বাধীনতার পর একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরে জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ দেশের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংসদে পরিণত হয়।
তিনি আরও বলেন, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশে আবার গণতান্ত্রিক সংকট দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনের মাধ্যমে এরশাদ সরকারের পতন এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
ওয়ান-ইলেভেনের পর দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আবার বাধাগ্রস্ত হয় বলেও মন্তব্য করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার। তার ভাষ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচন ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করে।
কায়সার কামাল বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্টদের প্রচেষ্টায় ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ওই নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি করে তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এবং সেই অভিযাত্রার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে জাতীয় সংসদ।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন