দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং সংস্থাটির সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে নিষেধাজ্ঞার কারণ ব্যাখ্যা করা হয়। সেখানে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের নামে র্যাবের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আইনের শাসন, মানবাধিকার, মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট জানায়, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশে ছয় শতাধিক মানুষ গুম এবং ২০১৮ সাল থেকে প্রায় ৬০০ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদেরও এসব কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় প্রথমেই ছিল বেনজীর আহমেদের নাম। তিনি ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক হন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন।
র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে বেনজীর আহমেদের দায়িত্বকালে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে দেশজুড়ে বহু কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ২০১৮ সালের মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগে সম্পৃক্ততার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
একই ঘটনার সূত্রে র্যাব-৭-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপরও ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো ওই সময় গুম ও কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এসব ঘটনাকে আত্মরক্ষার্থে চালানো গুলি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর বেনজীর আহমেদ অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। গুমসংক্রান্ত অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে তিনি বলেছিলেন, লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৫৯ বছর পূর্ণ হওয়ায় সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যান বেনজীর আহমেদ। পরে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধান চলার মধ্যেই ২০২৪ সালের ৪ মে তিনি সপরিবারে দেশ ছেড়ে যান। পরে দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাঁর বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন।
বিদেশে অবস্থানকালে আর্থিক অপরাধের অভিযোগে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁর বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১২ জুন ইন্টারপোলের সহায়তায় দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেনজীর আহমেদকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বেনজীর আহমেদ ছাড়াও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় ছিলেন র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তিনি ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল র্যাবের দায়িত্ব নেন এবং পরে পুলিশের আইজিপি হন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে আছেন।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও ছিলেন র্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ। তিনি ২০২১ সালের ১৬ মার্চ থেকে ওই পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অন্য কর্মকর্তারা হলেন র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তফা সরওয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম এবং সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার লতিফ খান।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী আদেশ ১৩৮১৮-এর আওতায় এসব নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সম্পদ অবরুদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে এ আদেশে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বেনজীর আহমেদের কোনো সম্পদ থাকলে তা জব্দ বা অবরুদ্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন