বিটিআরসিতে একসময়কার একক প্রভাব ও দখলদারিত্ব এখন বগুড়ার বিএনপি নেতা ও এমপিপুত্র আসিফ রাব্বানীর হাতে। আসিফ রাব্বানী বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মওলা সিরাজের পুত্র । জানা যায় , আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর আসিফ রাব্বানি টেলিকম ব্যবসার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রন নেন। তার হয়ে সিন্ডিকেট তদারকি করেন 'ইউনিক ইনফো'র সিইও মাহতাব ।
অভিযোগ রয়েছে, স্বৈরচার হাসিনা আমলে নেপথ্যের নায়ক হিসেবে পরিচিত মাহতাব আমিন ও তার স্ত্রী আফসানা আখতারের ব্যাংক হিসাবেও বিপুল অংকের অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
বিটিআরসি সুত্র জানিয়েছে,বিদেশ থেকে দেশে আসা কলের ব্যবসায় বর্তমানে ২৩টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের নেপথ্য মালিকানাধীন গ্লোবাল ভয়েজ এবং আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপের প্রতিষ্ঠান রুটস কমিউনিকেশন অন্যতম।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার আমলে ‘আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরাম’ (আইওএফ) নামে পুরো ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয় সালমান এফ রহমানের প্রভাবাধীন একটি বলয়। গ্লোবাল ভয়েজের নেপথ্য মালিক হিসেবেও তার নাম উঠে আসে। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ‘মার্কেট ডেভেলপমেন্ট’-এর নামে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে সালমান এফ রহমানসহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিটিআরসি মামলা দায়ের করেছে।
সূত্রের বলছে , গেটওয়ে ব্যবসা থেকে আয় হওয়া অর্থের মধ্যে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার ডলার ‘অফিস খরচ’ নামে তুলে নিত তৎকালীন আইজিডব্লিউ অপারেটরস ফোরাম, যা ছিল পুরোপুরি অনৈতিক। বাকি অর্থের মধ্যে প্রায় ২ শতাংশ করে ভাগাভাগি হতো বাংলা টেক, মিট টেলিকম, নভো, ডিজিকন, ইউনিক ইনফো, সালমান এফ রহমান নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল ভয়েজ এবং আব্দুস সোবহান গোলাপের রুটস কমিউনিকেশনের মধ্যে। অথচ ২৩টি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও বাকি ১৬টি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যে জুটত নামমাত্র ১ শতাংশ।

ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর গ্লোবাল ভয়েজ ও রুটস কমিউনিকেশন বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে , ব্যবসার টাকা ভাগাভাগির এই ‘গোলামি প্রথা’ চালু করেছিলেন সালমান এফ রহমান, আর এর বুদ্ধিদাতা ছিলেন ইউনিক ইনফোর সিইও মাহতাব আমিন। বিনিময়ে তিনি অলিখিতভাবে অনৈতিক সুবিধা পেতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ সুবিধার ভাগিদার ছিলেন সালমান এফ রহমান প্রতিষ্ঠিত আইওএফের দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যাদের একজন তৎকালীন সময়ে গ্লোবাল ভয়েজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। যদিও ক্ষমতার পালাবদলের পরও তারা বহাল আছেন। সূত্রের ভাষ্য, এদের একজনের নামের প্রথম অক্ষর ‘মু’ এবং অপরজনের ‘শা’। এই তিনজনের অঘোষিত সিন্ডিকেট এখনও বিটিআরসির গেটওয়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ।
মাহতাব আমিন এবং আইওএফের ওই দুই কর্মকর্তাও বিটিআরসির দায়ের করা মামলার আসামি। ওই মামলায় বলা হয়েছে, সালমান এফ রহমান, মাহতাব আমিনসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে তহবিলের প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা টেলিকম মার্কেট উন্নয়নে ব্যয় না করে বেক্সিমকোর একটি সিস্টার কনসার্নে স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন।
এদিকে মাহতাব আমিনের স্ত্রী আফসানা আখতারের ব্যাংক হিসাবেও অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার দাবি উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক ডজন ব্যাংকে আফসানা আখতারের নামে প্রায় তিন ডজন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য একটি গোয়েন্দা সংস্থা পেয়েছে। সংস্থাটি আরও জানতে পেরেছে, ইউএসএইডে কর্মরত আফসানা আখতার ও তার স্বামী মাহতাব আমিন উত্তরা এলাকায় মাত্র সাড়ে ১৭ লাখ টাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা দেখিয়েছেন। এছাড়া নন্দনকাননে একটি ফ্ল্যাটের মূল্য দেখিয়েছেন সাড়ে ৬৩ লাখ টাকা। আর্থিক মূল্য কম দেখাতেই স্বামী-স্ত্রী মিলে এ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ।
বিটিআরসি সূত্র জানায়, ইতোমধ্যে আইওএফের নামে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় ভাগ বসানোর এই ‘গোলামি প্রথা’ বন্ধে নির্দেশনা দিয়েছে কমিশন। কিন্তু সে নির্দেশনা মানতে নারাজ আসিফ রাব্বানির প্রতিষ্ঠান ইউনিক ইনফো। বরং গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠানটি অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে কানেক্ট বা সুইচ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, গেটওয়ে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ যেহেতু মাহতাব আমিনের প্রতিষ্ঠানের হাতে, তাই তারা ইচ্ছামতো প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে। বিশেষ করে আসিফ রাব্বানির বাবা বগুড়ার এমপি হওয়ায় তার রাজনৈতিক প্রভাবও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। এতে দলের ভাবমূর্তি সংকটে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিটিআরসিতে কর্মরত একটি সূত্রের দাবি, আসিফ রাব্বানি কখনও তার বাবার জায়গায় নিজেকে সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন, আবার কখনও গিয়াস আল মামুনের নামও ভাঙান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বলেন, “প্রতিষ্ঠানটির মালিক বগুড়ার হওয়ায় তারা মূলত ক্ষমতার বড়াই করছে। ইউনিক ইনফোর মনমতো না হলেই আইওএফকে দিয়ে সেই প্রতিষ্ঠান বন্ধের হুমকি দেয়।”
উল্লেখ্য, গেটওয়ে ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে থাকা সিআইপি ও আইওএক্স নামের দুটি সুইচ আইওএফের দখলে রয়েছে। ফলে তারা ইচ্ছা করলে যে কারও সংযোগ বন্ধ বা চালু রাখতে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ক্ষমতা বিটিআরসি তথা সরকারের হাতে থাকা উচিত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইওএফের একজন কর্মকর্তা বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে সুইচ বন্ধ ও চালুর ক্ষেত্রে এমন কিছু ধারা তৈরি করা হয়েছে, যা বিটিআরসির ক্ষমতাকেও খর্ব করেছে। বিপরীতে আইওএফকে দেওয়া হয়েছে মূল চালিকাশক্তি। অর্থাৎ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা একটি সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই ব্যবস্থা রহিত না করলে বিকল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ রাব্বানি। একটি গণমাধ্যমের কাছে তিনি দাবি করেছেন, অভিযোগ সত্য নয়। একই দাবি করেছেন মাহতাব আমিনও।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন