ফ্যাসিবাদের যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন ও ষড়যন্ত্র রুখতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেছেন, প্রশাসনিক আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে সরকার নয়। সম্পূর্ণ আইনানুগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ এবং বিচার নিশ্চিত করা হবে।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘গণঅভ্যুত্থানের বাঁক বদলের দিন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও জনগণের প্রত্যাশিত গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব দেশের সর্বস্তরের মানুষের। স্বৈরাচারী শক্তি যেন আর কখনো দেশের গণতন্ত্রকে পদদলিত করতে না পারে, সে জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রয়োজন।
জুলাই আন্দোলনের শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের স্লোগানে যখন ইতিহাসের গতিপথ বদলে যাচ্ছিল, তখন তিনি নির্বাসনে থাকলেও আন্দোলনের প্রতি তাঁর পূর্ণ মনোযোগ ও সহযোগিতা ছিল।
দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কার প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিএনপির ৩১ দফার আলোকে নির্বাচনী ইশতেহার সাজানো হয়েছে। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ স্বাক্ষর করেছে। এ সনদ অনুযায়ী সংবিধান ও অন্যান্য আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হবে বলে তিনি জানান।
শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে গ্রেপ্তার এবং আদালতের রায় কার্যকর করা হবে। বিদেশে অবস্থানরত সাবেক সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনতেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গও বক্তব্যে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বিচারিক প্রক্রিয়ায় দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ
আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করা বা বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা কোনো প্রশাসনিক বা নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নই। সম্পূর্ণ আইনানুগ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগঠনটির রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারিত হোক—এটাই আমরা চাই।’
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হয়েছে। এর ফলে ব্যক্তি হিসেবে শেখ হাসিনার পাশাপাশি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে তাঁর দাবি।
সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সংগঠনের বিচারের বিধান রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের উদাহরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষকে হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগ দায় এড়াতে পারে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জুলাইয়ের সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতৃত্ব অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। বরং জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিয়ে দলটি আবার রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করছে।
জুলাইয়ের কৃতিত্ব জনগণের
জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে কোনো একক দল বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘জুলাই বিপ্লবের কৃতিত্ব কারও একার নয়। দেশের সাধারণ মানুষ বুক পেতে দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এর কৃতিত্ব তাঁদেরই।’
ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য স্বৈরাচারের পরিণতি শিক্ষণীয় করে রাখতে গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তর করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের শহীদদের স্বপ্নের নিরাপদ, গণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারমুক্ত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে তরুণ প্রজন্মসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। স্বাগত বক্তব্য দেন ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন