পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে শতভাগ পেশাদারিত্ব ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে কোনো ধরনের অন্যায্য রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না, ভবিষ্যতেও করা হবে না।
রোববার (২ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহী পুলিশ লাইনস মাঠে রাজশাহী রেঞ্জ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় রাজশাহীতে কর্মরত পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও সদস্যরা অংশ নেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন বর্তমান সরকারের প্রধান এজেন্ডা। পুলিশ রেগুলেশনস অব বেঙ্গল (পিআরবি) ও প্রচলিত আইন অনুসরণ করে বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো পুলিশ বাহিনীও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতা ধরে রাখতে পুলিশকে লাঠিয়াল ও পেটুয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। র্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থাকে যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গত পাঁচ মাসে সেই অবস্থা থেকে পুলিশের ভাবমূর্তির অনেকটা উন্নয়ন হয়েছে। সরকার ও পুলিশ বিভাগ ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা করছে—এটি জনগণও বুঝতে পারছে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরস্কার ও তিরস্কারের নীতি চালুর কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তার এবং জনসেবায় পেশাদারিত্বের পরিচয় দেওয়া পুলিশ সদস্যদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাদের সনদপত্র, পদোন্নতির রেটিং, আইজিপি পদক ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধের একটি বড় অংশ এখন সাইবার স্পেস ও ডার্ক ওয়েবকেন্দ্রিক। এ কারণে প্রতিটি মহানগর এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাইবার ল্যাব এবং অপরাধের ধরন ও হার বিবেচনায় প্রতিটি জেলায় প্রয়োজনীয় সাইবার ল্যাব স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিভাগীয় ফরেনসিক ও কেমিক্যাল ল্যাবের সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান তিনি। নারী পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালে দ্রুত বিশেষায়িত গাইনি ইউনিট চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর ও জেলা পুলিশের যৌথ ব্যবহারের জন্য খাসজমি চিহ্নিত করে একটি ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের আশ্বাস দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত জমি বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় মামলার নথির নিরাপত্তা নিশ্চিতে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেস ডকেট পুনরায় পুলিশের হেফাজতে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী। একই সঙ্গে আদালতে পর্যাপ্ত জায়গা, কেস ডকেট সংরক্ষণাগার, জেনারেল রেজিস্টার অফিসারের (জিআরও) কক্ষ, আধুনিক হাজতখানা ও মালখানা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের আবাসনসংকট নিরসনে শতাধিক মডেল থানা ভবন নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি। গণপূর্ত বিভাগের নির্মাণাধীন ভবনের গুণগত মান নিশ্চিত করতে জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শনের নির্দেশও দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘মব কালচার কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তবে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যুষিত এলাকায় স্বাভাবিক মিছিল-মিটিং আর মব এক বিষয় নয়। বেআইনিভাবে কাউকে জিম্মি করা কিংবা মব সৃষ্টি করলে কঠোর হাতে দমন করতে হবে।’
সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে পুলিশের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান সালাহউদ্দিন আহমদ। মতবিনিময় সভায় পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা, পরামর্শ ও প্রস্তাবনা শোনেন তিনি এবং সেগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের সভাপতিত্বে সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি আশিক সাইদ। এ সময় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন এবং অতিরিক্ত আইজিপি (অপরাধ ও অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
পরে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটক সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের জামিনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইউএই ত্যাগ করতে পারবেন না—এমন শর্তে তিনি জামিন পেয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। জামিনের চূড়ান্ত শর্ত জানতে আদালতের আদেশের প্রত্যয়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করা হয়েছে।
তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রসচিব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। সরকার সেখানে একটি অভিজ্ঞ আইনি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করেছে এবং বেনজীর আহমেদের জামিন বাতিলে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন বাতিল করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন