এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রেখে আইনের খসড়া প্রকাশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। খসড়াটির বিষয়ে জনগণের মতামত দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে পরিচালিত হবে। র্যাবের বর্তমান কাঠামোকে নতুন আইনি ভিত্তির আওতায় এনে বাহিনীটির দায়িত্ব, অভিযান পরিচালনা, মামলা তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির বিধান নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ অধিশাখা) মোহাম্মদ আবু নাঈম বলেন, র্যাবের নাম বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের লক্ষ্যে আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়া হবে। এরপর তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে আইনে পরিণত করার জন্য জাতীয় সংসদে তোলা হবে।
নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাবের বিদ্যমান আইনি ভিত্তি বিলুপ্ত হবে। তবে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু বিধান প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ কার্যকর রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, এসআরবির নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে। বাহিনীটির সদর দপ্তর ঢাকায় থাকবে। তবে দেশের যেকোনো স্থানে ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন ইউনিটের জন্য সরকার নির্ধারিত প্রতীক, পতাকা ও পোশাক থাকবে। পুলিশ ছাড়াও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সদস্যদের প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া যাবে। প্রেষণের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া আইনে এসআরবিকে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী আস্তানা, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে বাহিনীটি অভিযান চালাতে পারবে।
আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের সুযোগও রাখা হয়েছে। তদন্ত পরিচালনা করবেন অন্তত উপপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তা। পুরো প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। জব্দ করা মালামাল আদালতের আদেশ বা সরকারের বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে।
খসড়া আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তিতে একটি ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’ গঠন। কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।
কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিনিধি, এসআরবির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের পরিচালক এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি সদস্য হিসেবে থাকবেন।
কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত, প্রয়োজনে অনুসন্ধান দল গঠন এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি, পদায়ন, পদোন্নতি, বিভাগীয় শাস্তি ও অন্যায় আচরণসংক্রান্ত অভিযোগও পর্যালোচনা করতে পারবে।
ইউনিটের আইনানুগ কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিধিবহির্ভূত প্রভাব বিস্তার করলে তদন্তের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করার ক্ষমতাও কমিটিকে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
খসড়ায় সদস্যদের শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে মাদকাসক্ত থাকা, ঊর্ধ্বতনের নির্দেশ অমান্য, দায়িত্বে অবহেলা, বেআইনি অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্র বা সরঞ্জামের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা এবং জুয়া বা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে প্রেষণে থাকা সদস্যকে তার মূল বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
এসআরবির কোনো সদস্য শৃঙ্খলা লঙ্ঘন বা ফৌজদারি অপরাধ করে পালিয়ে গেলে তাকে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থার কথাও খসড়ায় বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক পলাতক সদস্যের এলাকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অনুরোধ জানাতে পারবেন। ওই অনুরোধকে ম্যাজিস্ট্রেটের জারি করা পরোয়ানা হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব রয়েছে।
নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়দায়িত্ব, চলমান মামলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিদ্যমান চুক্তি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত র্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যবিধি প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ কার্যকর থাকবে।
র্যাবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। খসড়ায় বাহিনীর নাম ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তনের পাশাপাশি জবাবদিহি বাড়াতে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি এবং সদস্যদের জন্য বিস্তারিত শৃঙ্খলা বিধি যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযান, গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও তদন্তের মৌলিক ক্ষমতার বড় অংশ নতুন বাহিনীতেও বহাল রাখার কথা বলা হয়েছে।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠিত হয় এবং একই বছরের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন