চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক শিশু হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর ও গ্রামাঞ্চল-সবখানেই শিশুদের ওপর নৃশংসতার অভিযোগ উঠছে। সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুর-পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা আক্তার হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সম্প্রতী রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তার হত্যার ঘটনায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে যাওয়ার পর শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরে একই ভবন থেকে তার মাথা বিছিন্ন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রামিসার বাবার অসহায় বক্তব্য মানুষের হৃদয় নাড়া দেয়। তিনি বলেন, ‘আমার এই আট বছরের বাচ্চার কী অপরাধ? আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করেন না।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও আদালতে দেওয়া আসামি সোহেল রানার জবানবন্দীতে জানা যায়, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। মরদেহ গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে।
শিশু রামিসার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের নানা প্রান্তে আরও কয়েকটি শিশু হত্যার ঘটনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করেছে।
গত এপ্রিল মাসে মানিকগঞ্জে সাত বছর বয়সী শিশু আতিকা আক্তার নিখোঁজ হয়। পরে একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, শিশুটির কানের স্বর্ণের দুল লুটের উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, অভিযুক্ত নাঈম শিশুটিকে হত্যার পর স্বর্ণালঙ্কার বিক্রির চেষ্টা করেন। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং কিছু স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করা হয়।
তবে এই ঘটনাটি আরও ভয়াবহ মোড় নেয়, যখন ক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্তের বাবা ও চাচাকে গণপিটুনি দেয়। এতে দুজনের মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ জানায়, শিশুহত্যা ও গণপিটুন-দুটি ঘটনাই পৃথক অপরাধ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।
নরসিংদীতেও ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়ে অপহরণ ও হত্যার শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর মামলার মূল আসামি নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা আত্মগোপনে চলে যান। পরে তাকে গাজীপুর থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। স্থানীয়ভাবে এ ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডেও এক শিশুকে গলাকাটা অবস্থায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশী বাবু শেখ শিশুটিকে হত্যার চেষ্টা করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা শিশুটি পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।
রাজধানীর বাড্ডায় তিন বছরের শিশু হাবিব হত্যার ঘটনাও মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়। অভিযোগ রয়েছে, মাদক কেনার টাকা না পেয়ে শিশুটির বাবা শাহিন মিয়া নিজের সন্তানের গলা টিপে হত্যা করেন। একই দিনে গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে আরও কয়েক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহে সুপারি চুরির অভিযোগ তুলে নয় বছর বয়সী এক শিশুকে নির্মমভাবে মারধরের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর শিশুটির মৃত্যু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, শিশুটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই নির্যাতন করা হয়েছিল। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মানবাধিকার মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১৬ মাসে অন্তত ৫২২ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২২৩ শিশু। গড়ে প্রতি মাসে ৭৬ জনের বেশি শিশু ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব ঘটনা শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়; এগুলো সমাজের গভীর নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। তাদের মতে, শিশুদের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র-সব জায়গাতেই নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাস্তবে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তবে দ্রুত বিচার মানে যেন তাড়াহুড়া করে দুর্বল তদন্ত নয়। সঠিক ফরেনসিক পরীক্ষা, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য, ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত-এসব নিশ্চিত করা না গেলে অনেক মামলাই আদালতে দুর্বল হয়ে পড়ে।
তারা বলছেন, অনেক ঘটনায় গ্রেফতার হলেও বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগে। এতে ভুক্তভোগী পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে এবং সমাজে একটি ধারণা তৈরি হয় যে গুরুতর অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শিশুদের ওপর সহিংসতার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, পারিবারিক কলহ, অর্থনৈতিক চাপ, অপরাধীর মানসিক বিকৃতি, শিশুদের প্রতি সমাজের অবহেলা এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রে শিশুর পরিচিত মানুষ, প্রতিবেশী বা পরিবারের সদস্যই অভিযুক্ত হিসেবে সামনে আসে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্ভর করলেই হবে না। পরিবার ও সমাজের ভেতরেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশু কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোনো আচরণগত পরিবর্তন হচ্ছে কি না-এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের বয়স উপযোগীভাবে নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা বিপজ্জনক পরিস্থিতি বুঝতে পারে এবং সাহায্য চাইতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার শিশু ও কিশোরীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করার পর আরও হুমকি, সামাজিক চাপ বা নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে। এ কারণে সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন।
শিশু সুরক্ষায় বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাবিত করণীয় হলো-প্রতিটি শিশু হত্যা ও নির্যাতন মামলার দ্রুত তদন্ত, বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার, ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, থানায় শিশু সংবেদনশীল ডেস্ক কার্যকর করা, স্কুলভিত্তিক শিশু সুরক্ষা শিক্ষা চালু করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কমিউনিটি নজরদারি বাড়ানো এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়া।
একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়ির মালিক, প্রতিবেশী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা দরকার। বহুতল ভবন, ভাড়া বাসা, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, প্রতিটি ঘটনার পর ক্ষোভ প্রকাশ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অপরাধের বিচার শেষ হয়েছে কি না, ভুক্তভোগী পরিবার সহায়তা পেয়েছে কি না, অভিযুক্ত দণ্ডিত হয়েছে কি না-এসব বিষয়েও ধারাবাহিক নজরদারি প্রয়োজন।
রামিসা, আতিকা, হাবিব কিংবা সীতাকুণ্ডের শিশুটির মতো ঘটনাগুলো জাতিকে বারবার একই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে এই সমাজে শিশুরা কতটা নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু হত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃশ্যমান কঠোর অবস্থান নিতে হবে। শুধু গ্রেফতার নয়, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারণ বিচার যত বিলম্বিত হবে, মানুষের আস্থা তত কমবে। আর বিচার যত দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে, ততই অপরাধীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা যাবে-শিশুর ওপর সহিংসতার কোনো ছাড় নেই।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন