ডিজিটাল যুগে প্রতারণার কৌশল আরও বহুমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। আগে ভুয়া ই-মেইল, বার্তা বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হলেও এখন সেই জায়গা দখল করছে ‘ভিশিং’ বা ভয়েস ফিশিং।
সাধারণ ফোনকলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৫ সালকে ভিশিং প্রতারণার বছর বললেও খুব বেশি ভুল হবে না। চলতি বছরেও এর ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।
গবেষণা ও পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ভিশিং আক্রমণ প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৩ সালে এ ধরনের প্রতারণায় ক্ষতির পরিমাণ ১২০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিচয় জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা কয়েক গুণ বেড়েছে। সাইবার গবেষকেরা বলছেন, ভিশিং এখন শুধু প্রতারণামূলক ফোনকলে সীমাবদ্ধ নেই। প্রযুক্তি, মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয়ে সংগঠিত অপরাধচক্র এ ধরনের প্রতারণা চালাচ্ছে।
মানুষের ভয় ও বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা নতুন ফাঁদ তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নামে পরিচিত নতুন ধরনের প্রতারণাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ ক্ষেত্রে প্রতারকেরা নিজেদের পুলিশ, সিবিআই বা অন্য কোনো সরকারি তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা ফোন করে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তিকে জানায়, তার নামে অপরাধমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্তের জন্য তাকে ভিডিওকলে থাকতে হবে।
ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন বা ভিডিওকলে আটকে রাখা হয়। কোনো কোনো ঘটনায় মানুষকে টানা ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় বিভ্রান্ত করে রাখা হয়েছে। আবার কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ বা এক মাস ধরে চলেছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
এই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অর্থ আদায় করে প্রতারক চক্র। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার।
পরিচিত কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা
এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির কণ্ঠস্বর প্রায় হুবহু নকল করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে পরিবারের সদস্য, বন্ধু কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তার পরিচিত কণ্ঠ শুনে অনেকেই সহজে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
প্রবীণ ও বয়স্ক ব্যক্তিদের ফোন করে বলা হচ্ছে, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য দুর্ঘটনায় পড়েছেন বা গুরুতর বিপদে আছেন। জরুরি ভিত্তিতে অর্থ পাঠানোর কথাও বলা হয়। পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে অনেকে প্রতারকদের কথায় বিশ্বাস করে অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচিত কণ্ঠ শুনলেও তথ্য যাচাই না করে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করা উচিত নয়। সন্দেহজনক ফোনকল পেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য মাধ্যমে সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যাংক হিসাব, পিন, পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা ব্যক্তিগত তথ্য ফোনে কারও সঙ্গে শেয়ার না করার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি সংস্থা বা ব্যাংকের পরিচয় দিয়ে কেউ ভয় দেখালে দ্রুত কল কেটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত নম্বরে যোগাযোগ করা উচিত।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন