মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটছে সরকার। জ্বালানি তেলের সাশ্রয় নিশ্চিত করা এবং অবৈধ মজুতদারি ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে এবং আমদানি করা জাহাজে যে তেল দেশের পথে রয়েছে, তা দিয়ে প্রায় এক মাসের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে-এই আশঙ্কা থেকেই আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে গতকাল থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রতিটি পাম্পে প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কম তেল সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির একাংশের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক জানান, সরবরাহ কিছুটা কমানো হলেও গ্রাহকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না কিনলে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না।
তবে সরবরাহ সীমিত হওয়া এবং আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। পাম্প মালিকরা আশা করছেন, সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এই চাপ কমে আসবে।
এদিকে অতিরিক্ত মজুত ও কালোবাজারি ঠেকাতে বিভিন্ন জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, অনুমোদনের বাইরে জ্বালানি তেল মজুত বা সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে রাজধানীর মহাখালীর সোহাগ ফিলিং স্টেশনে অবৈধভাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার অকটেন মজুত রাখার অভিযোগে অভিযান চালানো হয়েছে।
সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের প্রধান তেল ডিপোগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপিসি কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, খুলনার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুরের পার্বতীপুর এবং বরিশালের ডিপোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযম আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে সার কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পর সোমবার থেকে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমবে এবং জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কিছুটা হ্রাস পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) জেট-এ১ জ্বালানির দাম বাড়িয়ে নতুন হার নির্ধারণ করেছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের দাম প্রতি লিটার ১১২ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য জেট-এ১ জ্বালানির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ০.৭৩৮৪ মার্কিন ডলার।
তবে আপাতত অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন ও ডিজেলের খুচরা দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে সরকার। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশে জ্বালানি তেল রেশনিং করে ব্যবহার করতে হবে। তিনি জানান, সম্প্রতি দুটি তেলবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছেছে এবং সেগুলো থেকে জ্বালানি খালাস হলে দেশের মজুত আরও বাড়বে।
সরকার নির্ধারিত রেশনিং ব্যবস্থায় মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ দুই লিটার পেট্রোল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য বরাদ্দ ১০ লিটার। এসইউভি ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ লিটার এবং পিকআপ বা লোকাল বাসের জন্য দৈনিক ৭০ থেকে ৮০ লিটার ডিজেল নেওয়ার অনুমতি থাকবে। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি নিতে পারবে।
সরকারের এই রেশনিং ব্যবস্থার ঘোষণার পর অনেক জায়গায় আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন পাম্প মালিকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন