শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড-এ কথা শুধু প্রচলিত বাগধারা নয়, রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক সত্য। কোনো দেশ তখনই টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, যখন তার শিক্ষা ব্যবস্থা দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী, নৈতিক ও কর্মসংস্থানযোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, গত দুই দশকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো, জবাবদিহিতার অভাব এবং শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার বিচ্ছিন্নতার কারণে গভীর সংকটে পড়েছে।
আজ দেশে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণী রয়েছেন। কাগজে-কলমে তারা উচ্চশিক্ষিত। অনেকের জীবনবৃত্তান্ত ইংরেজিতে অত্যন্ত পরিপাটি; সেখানে ডিগ্রি, সার্টিফিকেট, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার দীর্ঘ তালিকা থাকে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চাকরির সাক্ষাৎকারে যখন তাদের ইংরেজিতে কথা বলতে বলা হয়, তখন অনেকেই স্বচ্ছন্দে যোগাযোগ করতে পারেন না, কেউ কেউ আবার তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে-এমন শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, যেখানে একজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করে, ইংরেজিতে সিভি তৈরি করে, অথচ পেশাগত পরিবেশে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না?
এই ব্যর্থতার দায় কেবল শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মেধা, পরিশ্রম, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই। মূল সংকট হলো সেই শিক্ষা কাঠামো, যা তাদের বাস্তব জীবনের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, প্রশাসন, ছাত্র রাজনীতি, একাডেমিক পরিবেশ এবং শিক্ষার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী শিক্ষার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং অস্বাস্থ্যকর প্রভাব প্রাধান্য পেয়েছে।
একটি শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবন ও কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করা। শিক্ষার মাধ্যমে তাদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ, ডিজিটাল সক্ষমতা, পেশাগত আচরণ এবং শিল্পখাতভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি হওয়া উচিত। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, অনেক শিক্ষার্থী ডিগ্রি সম্পন্ন করেও চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এর ফলেই শিক্ষিত বেকারত্ব আজ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেশী ভারত ও নেপালের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা, ইংরেজি যোগাযোগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতের সঙ্গে একাডেমিক সংযোগের ক্ষেত্রে তারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারত প্রযুক্তি, প্রকৌশল, ব্যবসায় শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আউটসোর্সিং খাতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নেপালও দক্ষতা উন্নয়ন, পেশাগত শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে অগ্রগতি করছে। বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে অনেক বড়; কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় গভীর ও কার্যকর সংস্কার অপরিহার্য।
রাজনৈতিক আনুগত্য কখনোই শিক্ষার মানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় প্রয়োজন মেধাবী, সৎ, যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব। শিক্ষক নিয়োগ হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা ও মেধার ভিত্তিতে-রাজনৈতিক পরিচয় বা ব্যক্তিগত প্রভাবের ভিত্তিতে নয়। শিক্ষার্থীদেরও শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস ও পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তোলার দিকে মনোযোগী হতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে শিল্পখাত এবং নিয়োগদাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে, যাতে পাঠ্যক্রম আধুনিক কর্মবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে। কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া এই সম্ভাবনাই একসময় জাতীয় বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। একটি মাস্টার্স ডিগ্রি শুধু একটি কাগুজে সার্টিফিকেট হওয়া উচিত নয়; এটি হওয়া উচিত জ্ঞান, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, পেশাদারিত্ব এবং কর্মসংস্থানযোগ্যতার প্রতীক।
এখন সময় এসেছে সততা, সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা কাঠামো, যা ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত, শিল্পখাতের চাহিদাভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। তাহলেই বাংলাদেশ দক্ষ গ্র্যাজুয়েট, দায়িত্বশীল নাগরিক এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরি করতে সক্ষম হবে।
ড. মুহাম্মদ শফিক
শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা
মন্তব্য (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। আপনিই প্রথম মন্তব্য করুন!
আপনার মতামত দিন